وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُون عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِين
তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমার কাছে প্রার্থনা কর আমি তোমাদের প্রার্থনা কবুল করব। যারা অহংকারবশত আমার ইবাদত হতে বিমুখ তারা অবশ্যই জাহান্নামে প্রবেশ করবে লাঞ্ছিত হয়ে। (আল-মুমিন : ৬০)
এ আয়াতে প্রমাণিত হল, যারা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না তারা অহংকারী। অতএব প্রার্থনা করলে অহংকার থেকে মুক্ত থাকা যাবে।
ইমাম শাওকানী রহ. বলেন : এ আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে দুআ অন্যতম ইবাদত। আর এটা পরিহার করা আল্লাহর সঙ্গে অহংকার করার নামান্তর। এ অহংকারের চেয়ে নিকৃষ্ট কোনো অহংকার হতে পারে না। কিভাবে মানুষ আল্লাহর সঙ্গে অহংকার করতে পারে যে আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছেন, তাকে সব ধরনের জীবনোপকরণ দিয়েছেন, যিনি জীবন দান করেন ও মৃত্যু ঘটান এবং ভাল-মন্দের প্রতিদান দিয়ে থাকেন ।
إن الله أمر المؤمنين ما أمر المرسلين… يا أيها الذِيْنَ آمَنُوْا كُلُوْا مِنَ الطَّيِّبَاتِ و اعْمَلُوْا صَالِحًا
আল্লাহ তাআলা মুমিনদেরকে সে জিনিসের আদেশ করেছেন যে জিনিসের আদেশ তিনি নবীদেরকে করেছেন। তা হল, হালাল খাও এবং সৎকাজ কর। রাসূলদেরকেও আল্লাহ সম্বোধন করে বলেছেন, তোমরা হালাল রিযিক গ্রহণ কর এবং আল্লাহর ইবাদত কর ।দোয়া কবুলের জন্য হালাল রিজিক ও সবব হতে পারে।
عَنْ أَبِي بَكْرٍ الصِّدِّيقِ، . أَنَّهُ قَالَ لِرَسُولِ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ عَلِّمْنِي دُعَاءً أَدْعُو بِهِ فِي صَلاَتِي . قَالَ " قُلِ اللَّهُمَّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي ظُلْمًا كَثِيرًا وَلاَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ إِلاَّ أَنْتَ فَاغْفِرْ لِي مَغْفِرَةً مِنْ عِنْدِكَ وَارْحَمْنِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ
আবূ বকর সিদ্দীক (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বললেন, আমাকে একটি দোয়া শিখিয়ে দিন যার দ্বারা আমি আমার নামাযের মধ্যে দোয়া করতে পারি। তিনি বলেনঃ তুমি বলো, ’’হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি আমার সত্তার উপর অনেক অত্যাচার করেছি, তুমি ভিন্ন গুনাহ মাফ করার আর কেউ নাই। অতএব তুমি আমাকে মাফ করে
দাও। কেননা তুমিই কেবল ক্ষমা করতে পারো এবং আমার প্রতি দয়া করো। নিশ্চয় তুমি ক্ষমাকারী, অতি দয়ালু’’
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ " مَنْ لَمْ يَدْعُ اللَّهَ سُبْحَانَهُ غَضِبَ عَلَيْهِ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর নিকট দোয়া করে না, আল্লাহ তার প্রতি অসন্তুষ্ট হন।
عَنِ النُّعْمَانِ بْنِ بَشِيرٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ " إِنَّ الدُّعَاءَ هُوَ الْعِبَادَةُ " . ثُمَّ قَرَأَ (وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ
নোমান ইবনে বশীর (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ দোয়াই হলো ইবাদত। অতঃপর তিলাওয়াত করেন (অনুবাদঃ) ’’এবং তোমার প্রভু বলেছেন, তোমরা আমাকে ডাকো আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দিবো’’
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، عَنِ النَّبِيِّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ قَالَ " لَيْسَ شَىْءٌ أَكْرَمَ عَلَى اللَّهِ سُبْحَانَهُ مِنَ الدُّعَاءِ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ মহান আল্লাহর নিকট দোয়ার চেয়ে অধিক সম্মানিত কোন জিনিস নাই।
عَنْ عَبْدِ اللَّهِ، عَنِ النَّبِيِّ ـ صلى الله عليه وسلم ـ أَنَّهُ كَانَ يَقُولُ " اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى
আবদুল্লাহ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ ’’হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট হেদায়াত, তাক্বওয়া, চরিত্রের নির্মলতা ও আত্মনির্ভরশীলতা প্রার্থনা করি’’।
عَبَّادِ بْنِ أَبِي سَعِيدٍ أَنَّهُ سَمِعَ أَبَا هُرَيْرَةَ، يَقُولُ كَانَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ يَقُولُ " اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الأَرْبَعِ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ وَمِنْ دُعَاءٍ لاَ يُسْمَعُ
আবূ হুরায়রা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেনঃ ’’হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট চারটি জিনিস থেকে আশ্রয় চাইঃ এমন জ্ঞান থেকে যা উপকারে আসে না, এমন অন্তর থেকে যা ভীত-বিহবল হয় না, এমন আত্মা থেকে যা তৃপ্ত হয় না এবং এমন দোয়া থেকে যা কবুল করা হয় না’’।
عَنْ جَابِرٍ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ " سَلُوا اللَّهَ عِلْمًا نَافِعًا وَتَعَوَّذُوا بِاللَّهِ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ "
জাবির (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ তোমরা আল্লাহর নিকট উপকারী জ্ঞান লাভের প্রার্থনা করো এবং অপকারী জ্ঞান থেকে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করো।
শহীদি মৃত্যু মুমিনের কামনা হওয়া উচিত। কেননা এই মৃত্যু সর্বোত্তম ও সবচেয়ে সম্মানজনক। নবীজি (স.) আল্লাহর কাছে শাহাদত কামনা করতেন। সাহাবায়ে কেরাম (রা.) সর্বদা শাহাদাতের মৃত্যু কামনা করেছেন।
হজরত ওমর (রা.) এই দোয়া করতেন বলে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত হয়েছে—اللَّهُمَّ ارْزُقْنِي شَهَادَةً فِي سَبِيلِكَ وَاجْعَلْ مَوْتِي فِي بَلَدِ رَسُولِكَ উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মার যুকনি শাহাদাতান ফি সাবিলিকা ওয়াঝআল মাওতি ফি বালাদি রাসুলিকা’ অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাকে আপনার রাস্তায় শাহাদাত নসিব করুন এবং আমার মৃত্যু আপনার রাসুলের শহরে দান করুন।’ (সহিহ বুখারি: ১৮৯০)
হযরত ওমর (রাঃ) এর শাহাদাত বরণ
মদীনায় মুগীরা ইবনু শু'বা এর আবুলুলু নামক একজন ইরানী গোলাম ছিল । একদি সে ওমর (রাঃ) এর নিকট তার মনিবের বিরুদ্ধে নালিশ দিল যে, আমার মনিব আমার প্রতি অতিরিক্ত মাশুল আরোপ করে রেখেছেন । আপনি তা কমিয়ে দিন । ওমর (রাঃ) তাকে মাশুলের পরিমাণ কত জিজ্ঞাসা করলে সে উত্তর দিল দু' দেরহাম । এবার জিজ্ঞাসা করলেন তুমি কি কাজ কর ? সে বলল আমি ছুতার মিস্ত্রি, ভাস্কর, ও কর্মকার । ইহা শুনে ওমর (রাঃ) তাকে বললেন তাহলে এটা তোমার জন্য অতিরিক্ত মাশুল নয় । গোলামটি এই জবাব শুনে খুবই অসন্তুস্ট হল এবং বলল আচ্ছা বুঝে নিব বলে সে চলে গেল । ওমর (রাঃ) বললেন এক গোলাম আমাকে হুমকি দিল । এর পর তিনি নিরব রইলেন ।
পরের দিন খুব ভোরে ওমর (রাঃ) নামাযের জন্য মসজিদে যান । আবুলুলু বিষাক্ত ছুরি লুলিয়ে রেখে পূর্ব থেকেই ওৎপেতে দাঁড়িয়েছিল । ওমর (রাঃ) নামাযের তাকবীর বলার সংগে সংগে সে উক্ত বিষাক্ত ছুরি দ্বারা তার কাঁদে ও নাভীতে ক্ষীপ্ত হস্তে ছয়টি আঘাত করে । পার্শ্ববর্তী লোকেরা আবুলুলুকে ধরার জন্য এলে তাদেরকেও উক্ত ছুরি দ্বারা আঘাত করে, পরে যখন দেখল তার নিজের পরিত্রাণের উপায় নেই তখন সে নিজে নিজেই উক্ত ছুরি দ্বারা আত্নহত্যা করল ।
আহত হওয়ার পর ওমর (রাঃ) আব্দুর রাহমান ইবনু আওফ (রাঃ) কে নামায পড়াবার নির্দেশ দিলেন । ইবনু আওফ (রাঃ) অতিদ্রুত নামায় আদায় করলেন । এদিকে ওমর (রাঃ) মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন । নামায শেষ হওয়ার পর ওমর (রাঃ) কে তার বাড়িতে আনা হল, তিনি লোকদের জিজ্ঞারা করলেন আমার হত্যাকারী কে ??? উত্তর দেওয়া হল আবুলুলু । আবুলুলুর নাম শুনে তিনি এই বলে আল্লাহর শোকর আদায় করলেন যে, আমার রক্তে কোন মুসলমানের হাত রঞ্জিত হয় নাই ।
ওমর (রাঃ) এর চিকিৎসার জন্য জনৈক আনসারী চিকিৎসককে ডাকা হল । তিনি উনাকে শক্তির জন্য দুধ পান করান । সেই দুধ সাথে সাথেই ক্ষত স্তান দিয়ে বেরিয়ে পড়ল । এটা দেখে চিকিৎসক ওমর (রাঃ) কে বললেন হে আমিরুল মুমিনীন আপনি উত্তরসূরী নির্বাচন করুন । ( অর্থাৎ শেষ সময় উপস্তিত ) । এ কথা শুনে পার্শ্ববর্তী দাড়ানো লোকেরা কাঁন্নায় ভেঙে পড়লেন । ওমর (রাঃ) বললেন যারা কাঁদছে তারা আমার নিকট হতে চলে যাক । তোমরা শুননি রাসুল (সাঃ) ইরশাদ করেছেন- মৃতের আত্নীয় স্বজনের কাঁন্নার জন্য মৃতকে আযাব দেয়া হয় ।
হযরত ওমর (রাঃ) যখন বুঝলেন যে দুনিয়া থেকে বিদায়ের সময় অতিনিকটবর্তী তখন তিনি নিজ পুত্র আবদুল্লাহ (রাঃ) কে ডেকে বললেন হে পুত্র উম্মুল মুমিনীন আয়িশাহ (রাঃ) কে গিয়ে বল ওমর সালাম দিয়েছে । সাবধান, আমিরুল মুমিনীন বলবেনা । কারণ আমি এখন আমিরুল মুমিনীন নই । এরপর আরজ করবে, ওমর চায় আপনার কামরায় তার সম্মানিত দু' বন্ধুর পাশে তাকে স্তান দেয়া হোক ।
আবদুলল্লাহ (রাঃ) যখন আয়িশাহ (রাঃ) এর কাছে গিয়ে পৌছলেন তখন দেখলেন যে আয়িশাহ (রাঃ) বসে কাঁদছেন । তিনি যথাযথভাবে ওমর (রাঃ) এর বার্তা আয়িশাহ (রাঃ)এর কাছে পৌছে দিলেন । আয়িশাহ (রাঃ) বললেন, আমি নিজের জন্য এই স্তান সংরক্ষিত রাখতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমি তাকে আমার নিজের উপর প্রাধান্য দিচ্ছি ।
এরপর আবদুল্লাহ (রাঃ) ফিরে এলে ওমর (রাঃ) লোকদের ডেকে নিজেকে বসাতে বললেন । তাঁকে ভর দিয়ে বসানো হল । এরপর তিনি পুত্রের নিকট জানতে চাইলেন সে কি উত্তর নিয়ে এসেছে । আবদুল্লাহ (রাঃ) বললেন, আপনার ইচ্ছা পূর্ণ হয়েছে । ওমর (রাঃ) শুনে বললেন আলহামদুলিল্লাহ আমার সব চাইতে বড় ইচ্ছা ইহাই ছিল । এরপর তিনি নিজ পুত্রকে বললেন "দেখ আমার জানাযা দিয়ে যে সময় আয়িশাহ (রাঃ) এর কামরায় হাজির হবে তখন আবার সালাম জানাবে আর বলবে ওমর অনুমতি প্রার্থনা করছে । যদি তিনি অনুমতি দেন, তাহলে সেস্তানে দাফন করবে, নতুবা সাধারণ গোরস্তানের মাটিতে সমর্পণ করে দেবে ।
( ওমর (রাঃ) এর ইচ্ছা ছিল, আয়িশাহ (রাঃ) যেন সন্তুষ্টচিত্তে অনুমতি দেন । কোন প্রকার প্রভাব, কৃত্তিমতা বা সৌজন্যের অনুপ্রবেশ তাতে না ঘটুক ।
অন্তিমকালে তিনি নিজ পুত্র আবদুল্লাহ (রাঃ) কে বললেন, হে পুত্র আমাকে মাটিতে শুইয়ে দাও । আবদুল্লাহ (রাঃ) পিতার নির্দেশ পালন করলেন। এরপর তিনি আল্লাহর নিকট নিজ প্রাণ সপে দিলেন । "ইন্নালিল্লাহি ওআ ইন্না ইলাইহি রাজিউন" ।
আহত হবার তৃতীয় দিনে ২৭শে জিলহাজ্জ বুধবার রাতে ওমর (রাঃ) মুসলিম বিশ্বকে শোক সাগরে নিমজ্জিত করে দুনিয়ার জিবনে পরিসমাপ্তি লাভ করেন । পরের দিন সকালে তাঁর দাফন সমাপ্ত হয় । এ সময় তাঁর বয়ষ তাঁর দু' সম্মানিত বন্ধুর মতই ৬৩ বৎসর ছিল । তার খিলাফত কাল দশ বৎসর ছয় মাস চারদিন স্তায়ী ছিল ।
ইবরাহিম আলাইহিস সালামের দোয়া ।
رَبَّنَاۤ اِنِّیۡۤ اَسۡکَنۡتُ مِنۡ ذُرِّیَّتِیۡ بِوَادٍ غَیۡرِ ذِیۡ زَرۡعٍ عِنۡدَ بَیۡتِکَ الۡمُحَرَّمِ ۙ رَبَّنَا لِیُـقِیۡمُوا الصَّلٰوۃَ فَاجۡعَلۡ اَفۡئِدَۃً مِّنَ النَّاسِ تَہۡوِیۡۤ اِلَیۡہِمۡ وَارۡزُقۡہُمۡ مِّنَ الثَّمَرٰتِ لَعَلَّہُمۡ یَشۡکُرُوۡنَ
হে আমার প্রতিপালক! আমি আমার কতিপয় ৩০ সন্তানকে আপনার সম্মানিত ঘরের আশেপাশে এমন এক উপত্যকায় এনে বসবাস করিয়েছি, যেখানে কোন ক্ষেত-খামার নেই। হে আমাদের প্রতিপালক! (এটা আমি এজন্য করেছি) যাতে তারা নামায কায়েম করে। সুতরাং মানুষের অন্তরে তাদের প্রতি অনুরাগ সৃষ্টি করে দিন এবং তাদেরকে ফলমূলের জীবিকা দান করুন, ৩১ যাতে তারা কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে।
হজরত সাঈদ ইবনে জুবাইর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘যখন ইবরাহিম আলাইহিস সালাম তাঁর স্ত্রী এবং পুত্র সন্তানকে (জনমানব শূন্য কাবা প্রান্তরে) রেখে ফিরে আসেন এবং গিরি পথের বাঁকে এসে পৌঁছান।তখন তিনি কাবা ঘরের দিকে মুখ করে দাঁড়ালেন এবং দু’হাত তুলে দোয়া করলেন। হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের এ দোয়াটিকে আল্লাহ তাআলা সুরা ইবরাহিমের ৩৭নং আয়াত হিসেবে নাজিল করেন। আর তা হলো-উচ্চারণ-অর্থ-‘হে আমাদের প্রতিপালক! তোমার পবিত্র ঘরের নিকটে এমন এক ময়দানে আমার স্ত্রী ও পুত্রকে রেখে যাচ্ছি, যা (অনাবাদি) শস্যের অনুপযোগী এবং জনশূন্য (নির্জন প্রান্তর) মরুভূমি।হে প্রভু! এ উদ্দেশ্যে (তাদের উভয়কে রেখে যাচ্ছি) যে, তারা নামাজ প্রতিষ্ঠা করবে। অতএব তুমি লোকদের মনকে এ দিকে আকৃষ্ট করে দাও এবং প্রচুর ফল ফলাদি দ্বারা এদের রিযিকের ব্যবস্থা করে দাও। তারা যেন তোমার শুকরিয়া আদায় করতে পারে।’ (বুখারি)মুসলিম উম্মাহর উচিত নিজেদের পরিবার পরিজন, স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট উত্তম রিযিকের জন্য দোয়া করা।আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে হজরত ইবরাহিম আলাইহিস সালামের করা দোয়ার মাধ্যমে তাঁকে স্মরণ করে সাহায্য লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।
দোয়া কবুল হওয়া না-হওয়ার তিনটি ঘটনা
ইতিহাসে হাজ্জাজ ইবনে ইউসূফকে নিষ্ঠুর শাসক হিসেবে চিত্রিত করা হয়ে থাকে। উমাইয়া আমলের এ শাসনকর্তার অত্যাচার-নির্যাতনের বহু কাহিনী ইতিহাসে উল্লিখিত আছে। খলিফা আবদুল মালেকের পক্ষ হতে তিনি ইরাকের গভর্নর ছিলেন। এখানে আমরা হাজ্জাজের শাসননামলের এমন দুইটি ঘটনার উল্লেখ করতে চাই, যার একটি তাফসীর গ্রন্থে ও অপরটি ভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। দু’টি ঘটনাই দোয়া কবুল হওয়া না হওয়া সম্পর্কিত। প্রথম ঘটনাটি খরা ও দুর্ভিক্ষ সম্পর্কে, যা সংক্ষেপে এই:
দেশে দীর্ঘমেয়াদি খরা ও দুর্ভিক্ষ দেখা দেয় এবং পরিস্থিতি মারাত্মক আকার ধারণ করে। খরা কবলিতদের দুর্দশা, দুর্ভোগ চরম আকার ধারণ করে। সর্বত্র মানুষের মধ্যে হাহাকার দেখা দেয়। হাজ্জাজ ‘ইস্তেস্কার’ নামাজ (বৃষ্টির জন্য নামাজ) আদায়ের কথা ঘোষণা করেন এবং আলেম-উলামাসহ সর্বস্তরের সকল লোকের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক করেন। এই জন্য স্থান ও সময় নির্দিষ্ট করা হয়। রাষ্ট্রীয় নির্দেশনা অনুযায়ী যথা সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে সবাই উপস্থিত হন।
হাজ্জাজ ঘোষণা করেন, ‘ইস্তেস্কা’ নামাজের ইমাম হবেন এমন এক ব্যক্তি, যার ওপর আছরের নামাজ ফরজ হওয়ার পর একবারও কাজা হয়নি। অনেকক্ষণ অপেক্ষা করার পর একজনকেও পাওয়া গেল না ইমাম হিসেবে অগ্রসর হতে। নিরাশ হয়ে অবশেষে হাজ্জাজ ইবনে ইউসূফ নিজেই ‘ইস্তেস্কার’ নামাজে ইমাম হিসেবে দাঁড়ান এবং বৃষ্টির জন্য দোয়া, মোনাজাত করেন। বলা হয়, হাজ্জাজের মোনাজাত শেষ হতে না হতেই মুষলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। হাজ্জাজের আসরের নামাজ কখনো কাজা হয়নি বলেই তিনি কাউকে না পেয়ে নিজেই ‘ইস্তেস্কার’ নামাজ পরিচালনা করেছিলেন বলে ইতিহাসের তথ্য।
এক অন্ধ লোক কাবার সামনে গিয়ে দোয়া করছিল কিন্তু দোয়া ধরন হাজ্জাজ ইবনে ইউসুফের পছন্দ হচ্ছিলো না , তখন তিনি অন্ধ লোক কে বললেন আমার সাত চক্কর শেষ হওয়ার আগে যদি আপনার চোখ ভাল না হয় তাহলে আপনাকে কতল করে ফেলবো, তখন তিনি এমন মনুযোগ দিয়ে দোয়া শুরু করলেন সাত চক্কর শেষ হওয়ার আগেই তার চোখ ভাল হয়ে গেল। অন্যমনস্ক না হয়ে দোয়ার সকল আদব বজায় রেখে আমাদের দোয়া করা উচিত।
অপর ঘটনাটি ভিন্ন প্রকৃতির, যা ধর্মীয় গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে, তাও দোয়া সংক্রান্ত। বলা হয় যে, হাজ্জাজ ইবনে ইউসূফ যখন ইরাকের গভর্নর হিসেবে সেখানে গমন করেন, অনুধাবন করতে পারেন যে, ইরাকীরা তাকে পছন্দ করে না, সেখানে শাসনকার্য পরিচালনা করা খুব সহজ হবে না, তাছাড়া সেখানে এমন এক আল্লাহভক্ত ‘আওলিয়া দল’ রয়েছে যে, কোনো ব্যাপারে দোয়া করলে তাদের দোয়া কবুল হয়। তারা যদি হাজ্জাজের বিরোধী হয়ে যান তাহলে জনগণ বাধ্য থাকবে না, বিরোধী হয়ে যাবে। হাজ্জাজ অনেক চিন্তা ভাবনার পর একটি কৌশল স্থির করলেন। সেখানকার সকল অধিবাসীকে খাবারের দাওয়াত করবেন এবং তাতে আওলিয়া দলকে আমন্ত্রণ জানাবেন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় গণদাওয়াতের আয়োজন করা হয় এবং নির্ধারিত সময়ে সবাই দাওয়াতে অংশগ্রহণ করেন। হাজ্জাজ উপস্থিত সকলকে স্বাগত জানান এবং খাবার পরিবেশনে তদারকি করেন, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে আওলিয়া দলকে খাবার পরিবেশন করা হয়। এতে হাজ্জাজ খুবই সন্তুষ্ট হন এবং খাবারে অংশগ্রহণ করায় সবাইকে সাধুবাদ জানান, কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
আলোচনা প্রসঙ্গে হাজ্জাজ বলেন, এখন তিনি নিশ্চিন্ত, আওলিয়ারা বদদোয়া করলেও তাতে তার কোনো ক্ষতি হবে না। কেননা বদদোয়ায় ক্ষতির দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। তাদের বদদোয়া কবুল হবে না। কারণ খাবারের মধ্যে হারাম বস্তু মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল এবং আওলিয়া দলের পেটে তা প্রবেশ করেছে, তারা টেরও পাননি যে খাদ্য হারাম ছিল। হাজ্জাজ প্রতারণার মাধ্যমে আওলিয়া দলকে হারাম খাদ্য ভক্ষণ করিয়েছেন সে জন্য তার পাপের দায়ী তিনিই, কিন্তু যারা হারাম খাদ্য গ্রহণ করেছেন, তার প্রভাব প্রতিক্রিয়া তাদের দেহে থাকবে, তাদের দোয়া-এবাদত-বন্দেগী কিছুই কবুল হবে না।
আমাদের দেশের প্রতি তাকালে দেখা যাবে যে, এক শ্রেণির লোক এই ভয়াবহ করোনা, বন্যাকবলিত মারাত্মক পরিস্থিতিতেও আল্লাহকে ভয় করছে না। লুটপাট, আত্মসাৎ, ভেজাল, প্রতারণা, জাল-জালিয়াতি, চোরাকারবারি, খুন-খারাবি, হত্যাকান্ডসহ নানা ঘৃণ্য অপরাধকর্মের সাথে তারা জড়িত। সঙ্কট ও বিপর্যয়গুলোকেও বিন্দুমাত্র ভয় করছে না। তারা সমাজবিরোধী, নৈতিকতাবিরোধী এবং চরিত্রহননকারী কর্মকান্ডে লিপ্ত। অনুরূপ আরো বহু গর্হিত কর্মকান্ড অহরহ প্রদর্শিত হচ্ছে। এই শ্রেণির লোকদের বেপরোয়া কার্যকালাপ বন্ধ না হলে আল্লাহর গজব আরো দীর্ঘস্থায়ী হলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
মুহাদ্দিস আব্দুর রহমান ইবনে যিয়াদ-এর দোয়া ও মুক্তি
যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ছিলেন আব্দুর রহমান ইবনে যিয়াদ ইবনে আলগাম। তিনি সঙ্গীদের নিয়ে সাগরপথে সফরে ছিলেন। কনস্টান্টিনোপলের খ্রিস্টান শাসকের নৌবাহিনী (জলদস্যুরা) তাদের আটক করে নিয়ে যায়। উপরের নির্দেশে তাদের জেলে বন্দি করে রাখে। একবার খ্রিস্টানদের বড় দিন উপলক্ষে জেলখানায় কয়েদিদের ভালো খাবার পরিবেশন করা হয়। ওইদিন তাদের প্রতি বিশেষ যত্ন নেয়া হয়। ভালো খাবার ও আদর-আপ্যায়নে মুসলিম বন্দিরা খুব খুশি হয়। মুসলিম বন্দিদের খুশির খবর এক খ্রিস্টান নারী জানতে পেরে বাদশাহর কাছে এ মর্মে নালিশ করে বসেন যে, আরবরা আমার স্বামী ও ছেলেকে হত্যা করেছে; অথচ জেলখানায় আরব বন্দিদের এমনভাবে আপ্যায়ন করা হয়েছে- ‘যেন তারা মেহমান!’ খ্রিস্টান নারীর এ অভিযোগে বাদশা নিজেও রেগে যান এবং কয়েদিদের তার দরবারে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেন। কয়েদিদের তার সামনে নিয়ে আসা হলে বাদশাহ জল্লাদকে সবার শিরশ্ছেদ করার নির্দেশ দেন। জল্লাদ একে একে সব বন্দির শিরশ্ছেদ করতে করতে যখন হজরত আব্দুর রহমান ইবনে যিয়াদ ইবনে আলাগামের মুখোমুখি হলেন। তখন তার ঠোঁট নড়ছিল। তিনি কিছু পড়ছিলেন। বাদশাহ তা প্রত্যক্ষ করছিলেন। হজরত আব্দুর রহমান ইবনে যিয়াদ ঠোঁট নেড়ে কী যেন পড়ছিলেন। তিনি আল্লাহকে ডাকলেন, দোয়া করলেন আর তার মুখ দিয়ে বের হলো- اَللهُ... اللهُ رَبِّىْ لَا اُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا উচ্চারণ : ‘আল্লাহু… আল্লাহু রাব্বি; লা উশরিকু বিহি শাইআ।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ!... আল্লাহ তুমিই আমার প্রভু। আমি তোমার সঙ্গে কাউকে শরিক করি না।’ বাদশাহ জিজ্ঞাসা ও ক্ষমা এবার বাদশাহ জল্লাদকে থামতে বললেন। হজরত আব্দুর রহমান ইবনে যিয়াদ ইবনে আলগামকে জিজ্ঞাসা করলেন- তোমার ঠোঁট দিয়ে কী কথা বের হচ্ছে? তখন তিনি বললেন- اَللهُ... اللهُ رَبِّىْ لَا اُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا উচ্চারণ : ‘আল্লাহু… আল্লাহু রাব্বি; লা উশরিকু বিহি শাইআ।’ অর্থ : ‘হে আল্লাহ!... আল্লাহ তুমিই আমার প্রভু। আমি তোমার সঙ্গে কাউকে শরিক করি না।’ কনস্টান্টিনোপলের খ্রিস্টান শাসকের এ শব্দগুলো শোনা মাত্রই তার মধ্যে প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। বাদশাহ সঙ্গে সঙ্গে নির্দেশ দেন- তাকে ও তার সঙ্গীদের সবাইকে মুক্ত করে দাও। সুবহানাল্লাহ! এ ঘটনা থেকে প্রমাণিত চমর মুহূর্তেও যারা আল্লাহকে ভুলে না, মহান আল্লাহও তাদের ভুলেন না। বরং তাদের দান করেন সফলতা। তাদের জন্য খোলা থাকে মুক্তির দরজা। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে আল্লাহর ওপর ভরসা করার এবং তার একত্ববাদের প্রতি অগাধ আস্থা ও বিশ্বাস রাখার তাওফিক দান করুন। আমিন।
মায়ের দোয়া কবুল হওয়ার একটি বিস্ময়কর ঘটনাঃ
হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহর দরবারে তার জান্নাতের সাথীকে দেখার জন্য আরজি পেশ করেন । তখন আল্লাহ পাক তাকে নির্দেশ দেন অমুক শহরে যাও, একজন কসাই ব্যক্তি পাবে সেই জান্নাতে তোমার
সাথী হবে । হযরত মূসা (আঃ) আল্লাহপাকের প্রদত্ত নির্দেশনা মোতাবেক গমন করে একজন যুবককে দেখতে পেলেন। সেই যুবক মুসা (আঃ) - কে বললেন, আপনি কি আজ মেহমান হবেন? হযরত মূসা (আঃ) বললেন হ্যাঁ । ওই যুবকটির কাছে একটি বড় থলে ছিল যা কাঁধে নিয়ে তিনি রওয়ানা হলেন । তারা উভয়ে বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলেন এবং খাবার সম্মুখে রাখা হলো । মূসা (আঃ) লক্ষ্য করলেন, যুবকটি এক লোকমা মুখে দেয়ার আগে দুই লোকমা থলেতে রেখে দেন । ঠিক এমন সময় কেউ দরজায় কড়াঘাত করল । যুবক দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন । ওই সময় হযরত মূসা (আঃ) সেই থলের অভ্যন্তরে দৃষ্টিপাত করে আশ্চর্যান্বিত হলেন । তিনি দেখলেন ওই থলের ভিতর রয়েছে একজন বৃদ্ধ আর একজন বৃদ্ধা । তারা উভয়ে তার দিকে দেখে মুচকি হাসলেন এবং কলেমায়ে শাহাদাত পাঠ করে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন। এরপর ওই যুবক প্রত্যাবর্তন করে দেখলেন থলেটি মূসা (আঃ) এর সামনে পড়ে আছে । তখন
তিনি বললেন, অপনি আল্লাহর রাসূল মূসা (আঃ) । হযরত মূসা (আঃ) জিজ্ঞাসা করলেন
তোমাকে এ খবর কে দিল? তিনি বললেন এ থলেতে যে দুজন ছিলেন তারা আমার পিতা- মাতা আমি এভাবে তাদের থলেতে নিয়ে বহন করতাম এবং তাদের পানাহার করানোর আগে আমি পানাহার করতাম না। আর তারা আল্লাহপাকের দরবারে একটি দোয়া করতেন, "হে আল্লাহ! তোমার নবী মূসা (আঃ)-এর জিয়ারতের আগে আমাদের মৃত্যুর মুখে পতিত কর না" । এখন যেহেতু আমি দেখলাম তাদের দুজনার মৃত্যু হয়ে গেছে, তখন আমি উপলব্দি করলাম যে আপনি আল্লাহর রাসূল মূসা (আঃ)। তখন হযরত মূসা (আঃ) বললেন, "সুসংবাদ গ্রহন কর, তুমি হবে জান্নাতে আমার সাথী । বস্তুত পিতা-মাতার সেবা-যত্নের শুভ পরিনতিস্বরুপই ওই যুবক জান্নাতে হযরত মূসা (আঃ)-এর সাথী হওয়ার গৌরব অর্জন
করেছেন ।
ইসতেগফার এমন এক আমল,
যা মানুষকে আল্লাহর কাছে ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’ বানিয়ে দেয়। আর ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’ হলো এমন ব্যক্তি, যে ব্যক্তি দোয়া করতে দেরি; কিন্তু সে দোয়া কবুল হতে মুহূর্ত দেরি হয় না।
মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’ হওয়ার আমলটি ছোট্ট এবং সহজ। নিজেকে ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’ হিসেবে তৈরি করতে সব সময় ইসতেগফার করতে থাকা। ওঠা-বসা চলা-ফেরায় আল্লাহর কাছে ক্ষমা পার্থনার নিয়তে ‘আসতাগফিরুল্লাহ, আসতাগফিরুল্লাহ (اَسْتَغْفِرُ الله - اَسْتَغْفِرُ الله) বলতে থাকার নিয়মিত আমল করা। ছোট্ট একটি আমলের কারণেই সামান্য রুটি বিক্রেতা হয়েছিলেন ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’। যার দোয়া আল্লাহ তাআলা অভিনবভাবে কবুল করেছিলেন। যার সাক্ষী ছিলেন যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি নিজেই। ইমাম হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহির বর্ণনায় রুটি বিক্রেতার দোয়া কবুলের ঘটনা-
জগৎ বিখ্যাত মুহাদ্দিস হজরত ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি সারাজীবন হাদিস সংগ্রহে কাটিয়ে দিয়েছেন। এটি তার শেষ জীবনের ঘটনা। একবার তিনি বৃদ্ধ বয়সে হাদিস সংগ্রহে এক সফরে বের হয়েছিলেন।
সফরের মধ্যে রাত একবার এক মসজিদে মাগরিব আর ইশা নামাজ আদায় করেন এবং রাত অতিবাহিত করার চিন্তা করেন। সময়টি ছিল শীতকাল। তিনি চিন্তা করলেন ফজরের নামাজ পড়েই এ মসজিদ থেকে বিদায় নেবেন।
তিনি মসজিদে বসে শীতের কাপড় মুড়ি দিয়ে হাদিস পড়া শুরু করলেন। এমন সময় মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণকারী এসে বললেন, এ এলাকার নিয়ম হচ্ছে, রাতে মসজিদে থাকা যাবে না।
মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল অনেক বিনয়ের সঙ্গে বলার পরও মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণকারী ব্যক্তি শুনলেন না। নিরুপায় হয়ে তাকে মসজিদ থেকে বের হতে হলো। শীতের রাতে হাটতে হাটতে এক বাজারে গিয়ে পৌছলেন। সেখানে রুটি বিক্রেতা এক যুবককে দেখলেন।
মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল রুটি বিক্রেতা যুবককে সালাম দিয়ে বললেন, হে যুবক! শীতের রাত, আমি কি তোমার কাছে আগুনের কাছে বসে রাতটা কাটাতে পারব?
যুবক বিনয়ের সঙ্গে সম্মতি জানিয়ে বললেন- ‘আহলান, ওয়া সাহলান! আপনাকে স্বাগতম। এটা আমার খোশ নসিব। আপনি এখানে আগুনের পাশে বসে রাত কাটালে আমার কোনো সমস্যা নেই।
মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল চুলার পাশে বসে হাদিস পড়ছিলেন। কিন্তু তিনি যুবকের একটা আমল লক্ষ্য করলেন। তাহলো-
যুবক রুটি তৈরিতে যা-ই করছেন, তাতেই তিনি ‘আসতাগফিরুল্লাহ’, ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ বলছেন। অর্থাৎ ইসতেগফারের আমল করছেন।
রুটি বিক্রেতা যুবকের এ আমল দেখে মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বলের কৌতুহল বেড়ে গেল। তিনি ভাবনায় পড়ে গেলেন। এবার তিনি হাদিসের কিতাব বন্ধ করে যুবককে বললেন-
হে যুবক! তোমার কী হয়েছে? শুরু থেকেই দেখছি, তুমি যে কাজ-ই করছে সঙ্গে সঙ্গে ইসতেগফার (আসতাগফিরুল্লাহ) পড়ে যাচ্ছ। ঘটনা কী? কেন তুমি এত বেশি ইসতেগফার ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ পড়ছো?
এবার যুবক তার আমল ও প্রাপ্তির কথা জানালেন এবং আমি ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’। আমি যে দোয়া করি তা কবুল হয়ে যায়। আমার জীবনের কোনো চাওয়া-ই আল্লাহ বাকি রাখেন নি। তবে আমার একটি দোয়া এখনো কবুল হয়নি। রুটি বিক্রেতা যুবকের কথা শুনে মুহাদ্দিস ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহির কৌতুহল আরও বেড়ে গেল।
যুবকের এ কথা শুনে মুহাদ্দিস আহমাদ ইবনে হাম্বল একেবারেই অবাক। তিনি যুবককে আবারও প্রশ্ন করলেন, তুমি ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’? তুমি যে দোয়া কর, তাই কবুল হয়ে যায়? যুবক বললেন, ‘হ্যাঁ’, আমি দোয়া করলেই কবুল। তবে আমার একটা দোয়া এখনো কবুল হয়নি। সেটি ছাড়া আল্লাহ আমার সব দোয়া কবুল করে নিয়েছেন। এবার ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল আগ্রহ-কৌতুহল নিয়ে জানতে চান, তোমার সেই দোয়া কী? যা এখনো কবুল হয়নি?
এবার রুটি বিক্রেতা যুবক বললেন, আমার যে দোয়া কবুল হয়নি, তাহলো- আমি শুনেছি এ জামানার সবচেয়ে বড় শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিস ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল।
আমার ইচ্ছে হলো- ‘তাঁকে এক নজর দেখা এবং তার হাতে হাত রেখে মোসাফাহ কর। আর তাঁর কপালে একটা চুম্বন করা।’
আমি অনেক কাকুতি-মিনতি করেছি, আল্লাহ তাআলা আমার এ দোয়া এখনও পূরণ করেননি। আল্লাহ যে কেন আমার এ দোয়াটা কবুল করছেন না; তা আমি বুঝতে পারছি না।
এবার মুহাদ্দিস ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহি খুবই আবেগ প্রবণ হয়ে গেলেন। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন-
হে যুবক! আল্লাহ তোমার এ দোয়াও কবুল করেছেন। ‘হে যুবক! তুমি যে আহমাদ ইবনে হাম্বলের সঙ্গে দেখা করার জন্য দোয়া করছ। তোমার তার কাছে যাওয়ার দরকার নেই। তোমার প্রভু তাকে তোমার কাছে পৌছে দিয়েছেন।
হে যুবক! আমি-ই ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল। আহমাদ ইবনে হাম্বল নিজেই তোমার কাছে ছুটে এসেছে।’ (সুবহানাল্লাহ) সঙ্গে সঙ্গে যুবক চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে জড়িয়ে ধরলেন। তার হাতে হাত রাখলেন আর তাঁর কপালে চুমু খেলেন এবং কাঁদকে থাকলেন। মুহাদ্দিস ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বালের কাছে দোয়া চেয়ে বললেন- ‘হে ইমাম! আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমার কোনো দোয়া-ই বাকি রাখেননি। যা একটা বাকি ছিল তাও আল্লাহ তাআলা কবুল করে নিয়েছেন।
এ হচ্ছে ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’র নমুনা। মহান আল্লাহ তার কাছে অবিরাম ক্ষমা প্রার্থীকে ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’তে পরিণত করে দেন।
সুতরাং মুমিন মুসলমানের উচিত, যে কোনো প্রয়োজনে বেশি বেশি ইসতেগফার করা। ইসতেগফারের আমল বিফলে যায় না। ইসতেগফার করে যে দোয়া-ই করা হয়, তা-ই কবুল হয়ে যায়। আর যদি কোনো বান্দা ‘আসতাগফিরুল্লাহ’ অর্থাৎ ইসতেগফারের সঙ্গে আঠার মতো লেগে থাকে তবে সে হবে ‘মুঝতাঝাবুদ দাওয়াহ’। আল্লাহ তাআলা ইসতেগফারের কারণে ওই বান্দার সব চাওয়া পূরণ করে দেবেন।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে সব সময় বেশি বেশি ইসতেগফারের সঙ্গে লেগে থাকার তাওফিক দান করুন। ইসতেগফারের ছোট্ট আমল বেশি বেশি করার তাওফিক দান করুন। সুন্নতে নববির অনুসরণ ও অনুকরণের তাওফিক দান করুন। আমিন।
ফেরাউনের কবল থেকে মুক্তি পেতে যে দোয়া করেছিলেন আছিয়া
মিসরের তৎকালীণ প্রতাপশালী কাফির শাসক ফেরআউন। তার স্ত্রী আছিয়া বিশ্ব জাহানের মালিক আল্লাহর প্রতি ঈমান এনেছিলেন। আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে তিনি তৎকালীন বিশ্বের সব থেকে মনোরম রাজপ্রাসাদ, আরাম আয়েশ ত্যাগ করেছিলেন। পৃথিবীর এই সুখ-শান্তি তার কাছে তুচ্ছ মনে হয়েছিলো। আল্লাহর ওপর ঈমান এনেই অন্তরের প্রশান্তি পেয়েছিলেন আছিয়া। তৎকালীন সময়ের আসমানী ধর্ম পালনের কারণে ফেরআউন তার ওপর চরম অত্যাচার-নির্যাতন করেছিলো। ফেরআউনের সৈন্য-সামন্ত তার হাত-পা বেঁধে উত্তপ্ত সূর্যের নিচে ফেলে রাখতো। তাকে কঠিন শাস্তি দিতো। নির্যাতনে তার দেহ রক্তাক্ত-ক্ষতবিক্ষত হয়ে যেতো, কিন্তু শত জুলুম-নির্যাতনের মুখেও তিনি ঈমানের পথ ত্যাগ করেননি। ফেরআউন যখন দেখলো কোনো নির্যাতনই আছিয়াকে ঈমানের পথ থেকে সরাতে পারছে না, তখন সে নিজের বিশ্বস্ত লোকদের সঙ্গে পরামর্শ করে আছিয়াকে হত্যার আদেশ দিলো। আছিয়া জীবনের বিনিময়ে নিজের ঈমানকে রক্ষা করেন। দুনিয়ার রাজপ্রাসাদের বিনিময়ে জান্নাতে আল্লাহর পাশে একটি ঘর চেয়ে দোয়া করেন। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তায়ালা তার এই দোয়ার কথা তুলে ধরেছেন এভাবে-
رَبِّ ابۡنِ لِیۡ عِنۡدَکَ بَیۡتًا فِی الۡجَنَّۃِ وَ نَجِّنِیۡ مِنۡ فِرۡعَوۡنَ وَ عَمَلِهٖ وَ نَجِّنِیۡ مِنَ الۡقَوۡمِ الظّٰلِمِیۡنَ
উচ্চারণ : ‘রাব্বিনি লি ইংদাকা বাইতান ফিল-জান্নাতি ওয়া নাঝঝিনি মিন ফিরআউনা ওয়া আমালিহি ওয়া নাঝঝিনি মিনাল ক্বাওমিজ জ্বালিমিনি।
অর্থ : ‘হে আমার প্রভু! আপনার কাছে আমার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করুন এবং আমাকে ফেরআউন ও তার (কুফরির) কর্ম থেকে নাজাত দিন; আর আমাকে জালিম সম্প্রদায় থেকেও মুক্তি দিন।’ (সুরা তাহরিম, আয়াত ১১)
সুতরাং মুমিন মুসলমান মাত্র মহান আল্লাহর কাছে হজরত আছিয়ার এ দোয়াটি বেশি বেশি করা জরুরি। কারণ যুগে যুগে ফেরআউনের অনুসারিরা দুনিয়ায় ছিল, আছে এবং থকবে। তাদের দুষ্কর্ম ও অত্যাচারীদের থেকে নিজেদের নিরাপদ রাখতে আল্লাহর কাছে এ দোয়া করা আল্লাহর নির্দেশের অন্তর্ভূক্ত। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে তাঁর কাছে জান্নাতে ঘর ও ফেরআউনের মতো দুষ্কর্ম ও অত্যাচারীদের থেকে আত্ম-রক্ষায় দোয়াটি পড়ার তাওফিক দান করুন। হজরত আছিয়ার মতো শত নির্যাতন ও অত্যাচারে ঈমানের ওপর অটল ও অবিচল থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।
