মানুষ সৃষ্টিগতভাবে পাপ প্রবণ। অভিশপ্ত শয়তান ও কুপ্রবৃত্তি মানুষকে প্রায়ই পাপাচার, অন্যায় ও নিষিদ্ধ কাজের দিকে তাড়িত করে। কমবেশি সব মানুষের মধ্যেই পাপের মনোবৃত্তি জাগ্রত হয়। কিন্তু সফল তো ওই ব্যক্তি, যে সুযোগ থাকার
পরও আল্লাহর শাস্তির ভয়ে পাপ ও অন্যায় থেকে আত্মসংবরণ করে। আর হতভাগ্য ও ধ্বংস প্রাপ্ত ওই ব্যক্তি, যে শয়তানের ফাঁদে পা দিয়ে কিংবা কামনা-বাসনার ডাকে সাড়া দিয়ে পাপ-পঙ্কিলতার অন্ধকারে হারিয়ে যায়। এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা কোরআনে কারিমে ইরশাদ করেন, যে নিজের আত্মাকে (পাপ-পঙ্কিলতা থেকে) পবিত্র করে সে সফল হয়, আর যে তাকে কলুষিত করে ধ্বংস হয় ।
وَقَدْ خَابَ مَنْ دَشْهَا
এবং সেই ব্যর্থ হইবে, যে নিজেকে কলুষাচ্ছন্ন করিবে I
। মানুষের অন্তরে অন্যায় ও পাপকাজের চিন্তা যখন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তখন কী করণীয়, সে বিষয়ে কিছু পরামর্শ প্রদান করা হলো। এসব পরামর্শ মতে পথ চললে আশা করা যায়, পাপে লিপ্ত হওয়া থেকে আল্লাহ তাআলা আমাদের রক্ষা করবেন।
(১) মনে পাপের চিন্তা জাগ্রত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে
‘আউজুবিল্লাহি মিনাশ শাইতানির রাজিম' অর্থাৎ বিতাড়িত শয়তান থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করছি পাঠ করা। আল্লাহতায়ালা এ মর্মে বলেন, ‘আর যদি শয়তানের প্ররোচণা তোমাকে প্ররোচিত করে, তাহলে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো । وَإِمَّا يَنزَغَنَّكَ مِنَ الشَّيْطَن نَزْغٌ فَاسْتَعِذْ بِاللَّهِ إِنَّهُ سَبِيع عَلِيمٌ
যদি শয়তানের কুমন্ত্রণা তোমাকে প্ররোচিত করে তবে আল্লাহর শরণ লইবে, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।
(২) মনে আল্লাহর ভয় জাগ্রত করা। অর্থাৎ এই চিন্তা করা
যে, আল্লাহতায়ালার অবাধ্যতা করলে তিনি ক্রোধান্বিত হবেন এবং জাহান্নামের আগুনে নিক্ষেপ করবেন। মানুষের কোনো অবস্থাতেই ভুলে যাওয়া উচিৎ নয় যে, পৃথিবীর কোনো মানুষ
না দেখলেও আল্লাহর চোখকে কোনোভাবেই ফাঁকি দেওয়া সম্ভব নয়। তিনি অবশ্যই বান্দার গোপন ও প্রকাশ্য সব কিছু দেখেন এবং প্রতিটি কর্ম সম্পর্কে পূর্ণ জ্ঞান রাখেন। তাছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত দুই কাঁধের
ফেরেশতা প্রতিটি কর্ম দিনরাত অবিরামভাবে লিখে চলেছেন। এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘অবশ্যই তোমাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত আছে। সম্মানিত আমল লেখকবৃন্দ। তারা
জানে, যা তোমরা করো ।
وَإِنَّ عَلَيْكُمْ لَحْفِقِينَ
অবশ্যই আছে তোমাদের জন্য তত্ত্বাবধায়কগণ
كِرَامًا كَاتِبِينَ
সম্মানিত লিপিকরবৃন্দ,
يَعْلَمُونَ مَا تَفْعَلُونَ
তাহারা জানে তোমরা যাহা কর।
(৩) আল্লাহ তায়ালার কাছে অন্তরের পরিশুদ্ধি ও আল্লাহ ভীতির জন্য দোয়া করা।
حَدَّثَنَا أَبُو بَكْرِ بْنُ أَبِي شَيْبَةَ، وَإِسْحَاقُ بْنُ إِبْرَاهِيمَ، وَمُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ نُمَيْرٍ، - وَاللَّفْظُ لاِبْنِ نُمَيْرٍ - قَالَ إِسْحَاقُ أَخْبَرَنَا وَقَالَ الآَخَرَانِ، حَدَّثَنَا أَبُو مُعَاوِيَةَ، عَنْ عَاصِمٍ، عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ الْحَارِثِ، وَعَنْ أَبِي عُثْمَانَ النَّهْدِيِّ، عَنْ زَيْدِ بْنِ أَرْقَمَ، قَالَ لاَ أَقُولُ لَكُمْ إِلاَّ كَمَا كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَقُولُ كَانَ يَقُولُ " اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ وَالْجُبْنِ وَالْبُخْلِ وَالْهَرَمِ وَعَذَابِ الْقَبْرِ اللَّهُمَّ آتِ نَفْسِي تَقْوَاهَا وَزَكِّهَا أَنْتَ خَيْرُ مَنْ زَكَّاهَا أَنْتَ وَلِيُّهَا وَمَوْلاَهَا اللَّهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنْ عِلْمٍ لاَ يَنْفَعُ وَمِنْ قَلْبٍ لاَ يَخْشَعُ وَمِنْ نَفْسٍ لاَ تَشْبَعُ وَمِنْ دَعْوَةٍ لاَ يُسْتَجَابُ لَهَا "
আবূ বাকর ইবনু আবূ শাইবাহ্, ইসহাক ইবনু ইব্রাহীম ও মুহাম্মাদ ইবনু আবদুল্লাহ ইবনু নুমায়র (রহঃ) ..... যায়দ ইবনু আরকাম (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি তোমাদের নিকট তেমনই বলব যেমনটি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন। তিনি (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) বলতেনঃ "আল্ল-হুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিনাল আজ্যি ওয়াল কাসালি ওয়াল জুৱ্নি ওয়াল বুখ্লি ওয়াল হারামি ওয়া আযা-বিল কবরি, আল্ল-হুম্মা আ-তি নাফসী তাকওয়া-হা ওয়াযাক্কিহা- আনতা খইরু মান্ যাককা-হা আনতা ওয়ালী ইউহা- ওয়া মাওলা-হা-, আল্ল-হুম্মা ইন্নী আউযুবিকা মিন ইলমিন লা- ইয়ান্ফা'উ ওয়ামিন কলবিনু লা- ইয়াখশাউ ওয়ামিন নাফসিন লা- তাশবাউ ওয়ামিন দা’ওয়াতিন লা- ইউসতাজা-বু লাহা-”
অর্থাৎ- "হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পানাহ চাই অপারগতা, অলসতা, ভীরুতা, বখিলতা, বার্ধক্যতা এবং কবরের শাস্তি থেকে। হে আল্লাহ! আপনি আমার অন্তরে পরহেযগারিতা দান করুন এবং একে সংশোধন করে দিন। আপনি একমাত্র সর্বোত্তম সংশোধনকারী এবং আপনিই একমাত্র তার মালিক ও আশ্রয়স্থল। হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট পানাহ চাই এমন ইলম হতে যা কোন উপকারে আসবে না ও এমন অন্তঃকরণ থেকে যা আল্লাহর ভয়ে ভীত হয় না; এমন আত্মা থেকে যা কক্ষনও তৃপ্ত হয় না। আর এমন দু’আ থেকে যা কবুল হয় না।"
(৪) মৃত্যুর কথা স্মরণ করা। হাদিসে এসেছে, গোনাহরত অবস্থায় যদি মৃত্যু হয় তাহলে কিয়ামতের দিন ওই অবস্থায় উত্তোলন করা হবে।
قال صلى الله عليه وسلم: "يبعث كل عبد على ما مات عليه
অপর এক জায়গায় রয়েছে।
يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّكُمْ تُحْشَرُونَ إِلَى اللَّهِ حُفَاةً عُرَاةً غُرْلاً كَمَا بَدَأْنَا أَوَّلَ خَلْقٍ نُعِيدُهُ وَعْدًا عَلَيْنَا إِنَّا كُنَّا فَاعِلِينَ
ইবনু আব্বাস (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, উপদেশ সম্বলিত ভাষণ প্রদানের উদ্দেশে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের মাঝে দাঁড়িয়ে বললেন, হে লোক সকল! তোমরা আল্লাহর সামনে খালি পা এবং উলঙ্গদেহে এবং খাতনাবিহীন অবস্থায় উপস্থিত হবে। (আল্লাহর বাণী) "যেমন আমি প্রথম দিন সৃষ্টি শুরু করেছিলাম, তেমনি তার পুনরাবৃত্তি করব। এটা আমার একটা ওয়াদা, তা পালন করা আমার দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত।
(৫) মনে রাখতে হবে, পাপের আনন্দ ক্ষণস্থায়ী। কিন্তু তার ক্ষতি ও করুণ পরিণতি দীর্ঘস্থায়ী। পাপের উন্মাদনা সাময়িক কিন্তু তার অনুতাপ দীর্ঘ মেয়াদি।
(৬) কোরআন তেলাওয়াত ও মুখস্থ করা, ইসলামি বই-পুস্তক পাঠ, নফল নামাজ আদায় এবং বিভিন্ন ধরণের দোয়া, জিকির,
তাসবিহ-তাহলিল এবং ইস্তিগফার ইত্যাদি পাঠ করা।
(৭) নির্জন স্থান ত্যাগ করে মা-বাবা, ভাই-বোন, দ্বীনদার আত্মীয়-স্বজন, ভালো চরিত্রবান বন্ধুদের সঙ্গে অথবা ভালো কোনো আলেমের সান্নিধ্যে অথবা মসজিদে গিয়ে সময় অতিবাহিত করা। পরিবার থেকে দূরে থাকলে তাদের সঙ্গে ফোনে কথা বলা বা ফোনে রক্ত সম্পর্কীয় আত্মীয়-স্বজনদের খোঁজ-খবর নেওয়া অথবা দীর্ঘদিন যোগাযোগ হয়নি এমন ভাই-বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করা।
(৮) করতে ভালো লাগে এমন কোনো দুনিয়াবি উপকারী কাজ করা, শরীর চর্চা করা কিংবা বাইরে খোলা স্থানে ঘুরতে যাওয়া। ঘরে চুপচাপ বসে বা শুয়ে থাকা ঠিক নয়। কারণ কথায় বলে,
‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।
(৯) সিনেমা, নাটক ইত্যাদি দেখা, গান-বাদ্য শোনা বা অশ্লীল গল্প, উপন্যাস ইত্যাদি পরিত্যাগ করা। কারণ এগুলো মনের
সুপ্ত বাসনা ও কু-প্রবৃত্তিকে জাগ্রত করে অনুরূপভাবে যে সব উপকরণ হাতের কাছে থাকার কারণে পাপের দিকে মন ছুটে যায় সে সব উপকরণকে ঘর থেকে বের করা বা নষ্ট করে ফেলা।
(১০) পাপের দিকে মনে প্রচণ্ড ঝোঁক সৃষ্টি হলেও ধৈর্যধারণ করা এবং নিজেকে পাপ থেকে সংবরণ ফরজ। কেউ পাপের নিয়ত করার পর যদি আল্লাহর ভয়ে তা পরিত্যাগ করে আল্লাহতায়ালা তার আমলনামায় গোনাহের পরিবর্তে সওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন।
এক যুবকের আল্লাহকে ভয় করার ঈমানদীপ্ত কাহিনী
ইয়াহিয়া ইবন আইয়ূব খাযাঈ (রহঃ) সূত্রে হাকিম (রহঃ) বর্ণনা করেছেন, (সংক্ষেপে) উমর (রাঃ) এর খিলাফাত আমলে এক অতি ইবাদাতকারী যুবক ছিল। সে সব সময় মাসজিদে পড়ে থাকতো। হযরত উমর (রাঃ) তাকে খুব মুহাব্বত করতেন।
এই যুবক ইশার সালাত পড়ে তার বৃদ্ধ পিতার খেদমতের জন্য চলে যেত। কিন্তু তার যাওয়ার পথে এক যুবতীর ঘর ছিলো এবং ওই যুবতী যুবকের উপর আসক্ত হয়ে পড়েছিলো। সে ঐ যুবককে ফুসলাতে থাকে। একদিন শেষ পর্যন্ত যুবকটি তার সাথে চলতে থাকে। যখনই যুবক ওই যুবতীর ঘরের কাছে এল তখন আল্লাহর ধ্যান চলে এল এবং কুরআনের এই আয়াত পড়তে পড়তে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল।
اِنَّ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا اِذَا مَسَّہُمۡ طٰٓئِفٌ مِّنَ الشَّیۡطٰنِ تَذَکَّرُوۡا فَاِذَا ہُمۡ مُّبۡصِرُوۡنَ ۚ
যারা তাকওয়া অবলম্বন করেছে, তাদেরকে যখন শয়তানের পক্ষ হতে কোনও কুমন্ত্রণা স্পর্শ করে, তখন তারা (আল্লাহকে) স্মরণ করে। ফলে তৎক্ষণাৎ তাদের চোখ খুলে যায়।
(সূরা আর আরাফঃ ২০১)
এরপর ওই যুবতী আর তার বাদী মিলে যুবকটিকে তার ঘরের সামনে ফেলে রেখে আসে আর তাদের ঘরে টোকা দিয়ে কেটে পড়ে। যুবকটির নিজের পরিবারের লোকেরা ওই অবস্থায় তাকে ধরে ঘরে নিয়ে তুলে। মাঝরাতে তার যখন জ্ঞান ফিরে তখন তাকে ঘটনা জিজ্ঞাসা করা হয়। তিনি ঘটনা খুলে বলেন। তার বাবা বললেন, তুমি কোন আয়াত পড়েছিলে? তখন যুবকটি এ আয়াত আবার পড়ে এবং আবারো চেতনা হারিয়ে ফেলে। এরপর যুবকটিকে নাড়িয়ে দেখা হলে দেখা যায় যে যুবকটি মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছে। এরপর রাতেই তার গোসল ও দাফনের
কাজ শেষ করা হল। পরের দিন উমর (রাঃ) এ ঘটনা শুনে তার পিতাকে বললেন আমাকে তার কবরের কাছে নিয়ে চল। অতএব, হযরত উমর (রাঃ) ও তার সংগীরা কবরের কাছে গেলেন। হযরত উমর (রাঃ) যুবকটিকে ডেকে বললেনঃ “হে অমুক, যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে তার জন্য রয়েছে দুটি জান্নাত।” (সূরা আর রহমান:৪৬)
তখন ওই যুবকটি কবরের ভিতর থেকে জবাব দিল এবং দুবার বললো, “হে উমার! আমার রব আমাকে জান্নাতের দুটি উদ্যান দিয়েছেন।”
সূত্রঃ কানযুল উম্মাল এ (১/২৬৭) এবং তাফসীর ইবনে কাসীরে (২/২৭৯) ঘটনাটি বর্ণিত হয়েছে। ইমাম বায়হাকী (রাহ) হাসান সূত্রে এটি বর্ণনা করেছেন। (কানযঃ ১/২৬৭) ।
উল্লেখ্য, কারো থেকে কোনো পাপ হয়ে গেলেকরণীয় হলো- দেরি না করে, অনুতপ্ত হৃদয়ে আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাওয়া এবং বেশি বেশি নেকির কাজ করা। তাহলে আল্লাহতায়ালা সব গোনাহ মাফ করে দেবেন- ইনশাআল্লাহ ।
