পঞ্চান্ন হাজার বর্গমাইল ঘেরা এ ভূখণ্ডের বিশ্বাসী মানুষ এ রাতের কথা ভুলবে না। নাস্তিকদের সমুচিত শাস্তির দাবীতে দিনভর সোচ্চার সফল অবরোধ শেষে ক্লান্ত-শ্রান্ত নবীপ্রেমিক মানুষগুলো যখন ঘুমিয়ে আছে, কিছু আল্লাহপ্রেমিক যিকির-নামায ও ইবাদতে নিমগ্ন- এমন শান্তিপ্রিয় নিরীহ মুমিন মুসাফিরদের উপর অতর্কিত নারকীয় তাণ্ডবে উন্মত্ত হয়ে ওঠে সরকারের পেটোয়া বাহিনী। তাদের ঘৃণ্য হিংস্রতায় সেদিন কেঁপে উঠেছিল আকাশ, থেমে গিয়েছিল রাতের স্নিগ্ধ বাতাস। ইসলামপ্রেমিক ঈমানদার মানুষের উপর নিজেদের খোদাদ্রোহী আক্রোশ মেটাতে সাঁজোয়া যান, বুলেট এবং প্রাণঘাতি অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পুলিশ-র্যাব-বিজিবির পোষাকে একদল হিংস্র মানুষ। আজ কয়েক বছর পেরিয়ে গেছে, তবুও সে ভয়াল রাতের ভয়ানক দৃশ্য চোখের সামনে ভাসছে। দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসা নিরপরাধ মুসলমানরা জান বাঁচাতে ছুটে পালাচ্ছিল এখানে ওখানে। আগুনের লেলিহান শিখা আর রাবার বুলেটের গগনবিদারী ধ্বনিতে শাপলা চত্বর কেঁপে উঠেছিলো বার বার,হাজার লাখো বার। ভেসে গিয়েছিল কিছু অকুতোভয় সাহসী বীরের উত্তপ্ত রক্তস্রোতে। এ বীর সন্তানদের শহীদী চিরঞ্জীব রুহের প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ সালাম।
এর আগে যেভাবে ঢাকায় দুপুর-বিকালের পর থেকে দফায় দফায় শান্তিপ্রিয় হেফাজত কর্মীদের উপর সন্ত্রাসীরা হামলে পড়ছিল, পিটিয়ে মেরে ফেলা হচ্ছিল নিরীহ মাদরাসা ছাত্রদেরকে- রক্তপিপাসু হায়েনাদের এসব হত্যাযজ্ঞ দেখে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল। তাই ইতিপূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্তাবলীর আলোকে এবং আমীরে মুহতারাম শায়খুল ইসলাম আল্লামা শাহ আহমদ শফী দা.বা. এর চূড়ান্ত ও অবিচল নির্দেশে শাপলা চত্বরেই শান্তিপূর্ণ অবস্থানের সিদ্ধান্ত নেয়া হয় সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে। অবস্থানের ঘোষণা প্রদান করেন হেফাজত মহাসচিব আল্লামা জুনায়েদ বাবূনগরী।
সেদিনের সন্ধ্যা পরবর্তী শান্তিপূর্ণ সমাবেশে জীর্ণ-শীর্ণ মলিন পোষাকের সাদামাটা মানুষগুলোর যিকির-তাকবীরে ক্ষমতার মসনদ কেঁপে ওঠেছিল শাসকের। তারা নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার্থে একটি নির্মম সিদ্ধান্ত নিল। এতে রক্ত ঝরল অজস্র মুমিন-মুসলমানের।
কিন্তু হায়! আজ সেই পাষণ্ড সরকারের বিরুদ্ধে কথা না বলে আঙুল তোলা হয়েছে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধে। পারস্পরিক কুৎসা-কলহে লিপ্ত হয়ে হেফাজতকে দুর্বল করে সরকারকে আরও গভীর ষড়যন্ত্রের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে কি অবলীলায়। ঈর্ষাকাতর হয়ে ভুল সিদ্ধান্তের নামে কিছু মিথ্যাচার দেখে আজ হৃদয়ে গভীর হাহাকার জেগে উঠে, কি সেলুকাস! কি বিচিত্র আমাদের সমাজ! আল্লাহ ও তার রাসূলের ভালোবাসায় উজ্জীবিত হয়ে যারা রক্ত দিল শাপলা চত্বরে- সেইসব বীরদের স্মৃতির প্রতি এ কেমন অবিচার! তাদের আত্মত্যাগের কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে আজ কেউ কেউ বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন পরস্পরের নামে। হেফাজতের সবাই তো একসাথে ছিলেন নীতি-নির্ধারণী ফোরামের অসংখ্য বৈঠকে। তবে কি কিছু লোক কুৎসা রটিয়ে হেফাজতকে কলঙ্কিত করে হামলাকারীদের নির্মমতাকে আড়াল করে দিতে চায়! দেশবাসীর সজাগ দৃষ্টিকে তারা কোনদিকে ঘুরিয়ে দিতে চায়! এভাবেই কি ইতিহাস মোছা যায়!
অন্য দিকে যারা হেফাজতের আন্দোলনে ছিলনা, হেফাজতের কমিটিতে ছিল না, হেফাজতের নীতি নির্ধারণী কমিটিতে ছিল না,হেফাজতের সাথে নূন্যতম সম্পর্ক ছিল না, ছিল হেফাজতের বিরোধিতায়, হেফাজতের আন্দোলনের প্রকাশ্য বিরোধিতায়, হেফাজত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনায় তারাই রক্তে লাল শাপলার পর অজানা কারণে হেফাজতের সবচেয়ে বেশী দরদী সেজে গেল। হেফাজতের জন্য মায়া কান্না করতে আরম্ভ করলো। মিডিয়া, সোশ্যাল মিডিয়া (ফেসবুক ইত্যাদিতে) সরাকারের ভাষায় কথা বলতে লাগলো। সরকারের টার্গেট করা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে গীবত আর বুহতানের বন্যা বয়ে দিলো। প্রশ্ন হচ্ছে, যারা আকাশ ভাঙ্গা মিথ্যাচার করলো- এরা কারা ? কি এদের পরিচয়?এরা কোন দলের? কোন পথের? এটা কি কারো অজানা? সবার কি জানা নেই ?
হ্যা, সরকার কিছু নেতাকে টার্গেট করলো। যুদ্ধ এবং আন্দোলনে অবশ্য এটাই নিয়ম। নির্দিষ্ট কিছু মানুষকে টার্গেট করতে হয়। টার্গেটে আক্রমণের পর আক্রমণ শানাতে হয়। আন্দোলন নস্যাৎ করতে হয়। সরকার তার কাজ করলো। তারা তা করবে এটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু আমাদের পোশাক পরে যারা এই মিথ্যা রটনা সাজালো, মিথ্যার ফুলঝুরি সাজালো, গীবত, বুহতান, অপবাদের পর অপবাদ ও সিমাহীন মিথ্যাচার করলো এবং আজো করে যাচ্ছে- ওদের কি হবে? অবশ্য তারা রাতকে দিন আর দিনকে রাত বানাতে এখনো ব্যস্ত সময় পার করছে। রাফেজী আর খারেজী ফেরকার ইতিহাস সবার পাঠ করা উচিৎ।
আরও স্পষ্ট করে বলি, যারা বলছেন, হেফাজতের ভুল সিদ্ধান্তে এতগুলো মানুষের প্রাণহানী ঘটেছে- তাদের কাছে সবিনয় জানতে চাই, একপক্ষকে দোষী বললে অপর পক্ষকে নির্দোষ বলতে হয়, তবে কি আপনারা হেফাজতকে ভুল বলে সরকারকে ধোয়া তুলসী পাতা প্রমাণ করতে চাচ্ছেন? সব দোষ সিদ্ধান্তগ্রহণকারীদের কাঁধে, আর এতে সরকারের মোটেও দায় নেই- এটাই কি আপনাদের অভিমত? সরকারকে নির্দোষ, মা’সুম প্রমাণের জন্য সরকারের নির্দেশনায়, প্রযোজনায়, পরিকল্পনায় এবং পরিবেশনায় কি আপনাদের এই জঘন্য মিথ্যাচার? নাকি ইসলামী জনতাকে বিভ্রান্ত করে গড়ে উঠা ইসলামী জাগরণকে ফুঁৎকারে নিভিয়ে দেয়ার মহাপরিকল্পনারই অংশবিশেষ? হেফাজতের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে গালি দিয়ে সরকারের হালুয়া-রুটির ভাগ পেতে কিংবা জালিমের সাথে আঁতাত করে পিঠ বাঁচাতেই কি আপনাদের এমন মিথ্যাচার? নাকি সাময়িক বিজয়ীদের প্রশংসা এবং ক্ষনিকের পরাজিতের বিচারের চিরচরিত পন্থা আঁকড়ে থাকার অপপ্রয়াস?
যারা বলেন, হেফাজতের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফীকে উল্টা-পাল্টা বুঝিয়ে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে- তারা কি একবারও ভেবে দেখেছেন- হিংসাপ্রসূত এমন গুজবের আড়ালে কি আমাদের মুহতারাম আমীরকে অক্ষম প্রমাণিত করা হচ্ছে না? তবে তো আপনার কথা আর সরকারী মিথ্যাবাদীদের বক্তব্যে কোনোই তফাত খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। নিজের অজান্তেই কি আপনারা সরকারের সাথে এক সুরে সুর মেলাচ্ছেন না?
যারা মিথ্যাচার ও ঈর্ষাকাতর কুৎসা রটনায় ব্যস্ত হয়েছেন, তাদের মুখোশ আজ উন্মেচিত।হেফাজতের সম্মানিত আমীরের বিরুদ্ধে প্ররোচিত হওয়ার অপবাদ এনে যারা নিজেদেরকে দূরদর্শী প্রমাণে ব্যস্ত- ইতিহাস ও সীরাত সম্পর্কে তাদের অজ্ঞতা, হীন মানসিকতা ও কাপুরুষতা আজ সবার কাছে প্রমাণিত।
যারা আজ মিডিয়ায়,ফেসবুকে কিংবা এখানে ওখানে বক্তব্য বিবৃতিতে এ নির্মমতার দায় হেফাজতের ভুল সিদ্ধান্তের কাঁধে চাপিয়ে সরকারকে আড়াল করে রাখতে চায়, আমরা চাইলেই আমাদের কাছে সুরক্ষিত সব সই-স্বাক্ষর প্রকাশ করে সেই মানুষগুলোর দ্বিমুখী আচরণ প্রমাণ করে দিতে পারি।
যেমন ৪ মে’র নীতি নির্ধারণী কমিটির যৌথ মিটিং এ লিখিত সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত সিদ্ধান্তের রেজুলেশনের হুবহু কপিটি আজ অনেকের কাছেই আছে। বিভিন্ন পত্রিকায় সচিত্র প্রতিবেদনেও ছাপা হয়েছে।
হেফাওত অন্য কোন প্রমাণ হাজির করার দিকে যাচ্ছে না। কারণ, যুগে যুগে ইতিহাস সাক্ষী, এমন রক্তসাগর নজরানা দিয়েই ইসলাম তার সুমহান অগ্রযাত্রা অব্যাহত রেখেছে। আর যারা ভীতু কাপুরুষ- যারা মদীনার সেই …… প্রজন্মের উত্তরসুরী- তারাই মিথ্যাচারের মোড়কে নিজেদেরকে সাধু সন্ন্যাসী প্রমাণে তৎপর রয়েছে।
হেফাজত মনে করে হেফাজতের আন্দোলন ১০০% সফল। সব সফলতা দৃশ্যমান হয় না, হতে পারে না। তার পরও আমরা বলি, যদি হেফাজতের পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্দোলনের সাফল্য দৃশ্যমান হতো ( দাবী আদায় হয়ে যেতো) তবে সাফল্যের সুতা পরিমাণ কৃতিত্বও নিয়েও টানা তানি হতো? আমরা নিশ্চিত, না, দেয়া হতো না। তাহলে বাস্তবে সফল দৃশ্যত অসফলতার দায়ভার কিছু নেতৃত্বের কাঁদে চাপিয়ে দেয়ার কারণ বা রহস্য কি ? হ্যাঁ, এটাই নিয়ম, এমনই হয়ে আসছে যুগে যুগে। সাফল্যের ক্ষেত্রে সব কৃতিত্ব আমার আর ব্যর্থতার ক্ষেত্রে ‘আমি কিছু ই জানি না’-এর চিরাচরিত ভাসার প্রয়োগ ! আল্লাহ ক্ষমাশীল।
আবারও সবিনয়ে মনে করিয়ে দিতে চাই, ৫ই মে রাতের অবস্থান এবং এর পূর্ববর্তী সিদ্ধান্তগুলো ছিলো সর্বসম্মত। কারো একক ভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব ছিল না, সম্ভব হয়ও না। যারা এমনটি মনে করে তারা অন্য জগতের মানুষ। রাজপথের আন্দোলন,সংগ্রাম, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্পর্কে তাদের কোন পরিচয় নেই। আর যারা আল্লামা শাহ আহমদ শফী এবং আল্লামা বাবুনগরীকে নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম প্রমাণিত করতে চাইছেন, তারা সরকারের মদদপুষ্ট দালাল। তারপরও যদি কারো সন্দেহ থাকে,তবে নীতি নির্ধারণী কমিটির বৈঠকে গৃহীত প্রস্তাব জেনে নিতে পারেন অথবা সেদিনের সই-স্বাক্ষর এবং সম্মিলিত সিদ্ধান্তুগুলোও দেখতে পারেন। অথবা চলে যান হাটহাজারীতে- সরাসরি জিজ্ঞেস করে আসুন আমাদের মুহতারাম আমীরকে বা মহাসচিবকে- এ সত্য চ্যালেঞ্জ আমাদের প্রথম ও শেষ সুস্পষ্ট প্রমাণ।
চারিদিকে এমন মিথ্যাচার ও ষড়যন্ত্রের কালোমেঘ দেখেও হেফাজত শঙ্কিত কিংবা হতাশ নয়। পবিত্র কুরআন যুগ যুগ ধরে আমাদেরকে একদল মুসলমান নামধারী ……র সংশ্রব থেকে সতর্ক করেছে- ।তাদের পরিচয় দিতে মহান স্রষ্টা আল্লাহ পাক বলেন, ‘যারা ঘরে বসে থাকে এবং নিজেদের ভাইদের সম্পর্কে বলে, আমাদের কথা মতো চললে তারা নিহত হতো না।’ (সূরা আলেইমরান-১৬৮)
হেফাজত শুরু থেকে আপোষহীন। আমাদের শক্তি ও সাহস এখনও অমলিন। কোনো মিথ্যাচার কিংবা গুজব হেফাজতে ইসলামের নেতৃত্ব ও ঐক্যে কণা পরিমাণও ফাটল ধরাতে পারবে না। বরং, যেসব দ্বিমুখী মানুষদের ভীতু চেহারা আজ উন্মোচিত, তাদের স্বার্থান্ধ উপস্থিতি থেকে মুক্ত হয়ে হেফাজত এগিয়ে যাবে আমাদের লক্ষ্যপানে। মহান আল্লাহ আমাদের সাথে।বিজয় আমাদের দ্বারপ্রান্তে।
