এইতো কিছুদিন আগের টাটকা স্মৃতি। শহরের কোলাহল এবং সংসার যজ্ঞের সকল বিড়ম্বনাকে পেছনে ফেলে বেছে নিলাম প্রিয় কয়টা দিন! জীবনের সকল ব্যস্ততাকে তুচ্ছ করে কয়েক দিনের জন্য ভাসিয়ে দিলাম আনন্দময় স্রোতে। হঠাৎ করেই সিদ্ধান্ত নিলাম কয়েক দিন নিজেদের মতো করে কিছুটা সময় কাটানোর। কোথায় যাওয়া যাই? বন, পাহাড়, সাগর আমাকে খুব মন পাগল করে। এক কথায় যাকে বলে আমি প্রকৃতি প্রেমিক।
এক সময় কয়েক বছরের জন্য চিটাগং পড়ালেখার সুত্রে ভাগ্যে জুটেছিল পার্বত্য জেলা রাঙামাটি ঘুরে দেখার। সেখানকার পাহাড়, ঝর্ণা, কাপ্তাই লেক, প্রকৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছিল প্রচুর। সেই স্মৃতি আজও অমলিন।
চিটাগং থাকাকালীন সময়ে রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান বেড়াতে গেলেও
খাগড়াছড়ি ও সাজেকে ঘুরতে যাওয়া হয়নি। তাই এবার সিদ্ধান্ত হলো সমগ্র পাবর্ত্য জেলা ঘুরে দেখবো। সিদ্ধান্ত ঠিক করতেই আমি তো আনন্দে আত্মহারা। তাই প্রাণের টানে “খাগড়াছড়ি, সাজেক, রাঙামাটি ও বান্দরবানের” নৈসর্গিক সৌন্দর্যের সাথে মিতালি করার জন্য এল মহেন্দ্রক্ষণ।
১২ মার্চ, রাত নয়টায় আমরা একই গ্রামের ১২ জন ভ্রমন যোদ্ধা আহমদ নগর নতুন বাজার হতে আগত হাইসে করে সরাসরি বান্দরবানের উদ্দেশ্যে যাত্রা শুরু করলাম। রাত দুইটার দিকে কুমিল্লায় হোটেলে ডিনার সেরে আবার রওনা হলাম। তখনো তেমন ভাবে মন পিঞ্জিরা আনন্দে বিগলিত বা উচ্ছাসে পুলকিত হয়নি। সবকিছু স্বাভাবিক ধরে গাড়িতে স্থির হয়ে বসে ঘুমানোর চেষ্টা করছি।
গভীর রাতে ফেনি পেরিয়ে গ্রামের ভিতর দিয়ে দু’পারের পাহাড়ের সারির মধ্য দিয়ে ভীষণ উঁচু-নিচু আঁকাবাকা পথ দিয়ে বান্দরবানের পথ ধরে গাড়ি ছুটলো। গাড়ীর হেড লাইটের অতটুকু আলোতে সামান্য দেখাতেই প্রাণটা নেচে উঠলো।আহা! একি দৃশ্য! এ যেন স্বপ্ন রাজ্যের রাজকুমার পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় করে রাজকন্যাকে সঙ্গে নিয়ে অচিন পথের অজানা ঠিকানায় ছুটতে শুরু করলো। এই অনুভুতির তুলনা হয় না।
গভীর রাতে পাহাড়ের মৌণতা ভেঙে সর্গজনে গাড়ীর ছুটে চলা, আর হেড লাইটের আলোয় প্লাবিত সকল প্রকৃতি বিমুগ্ধ নয়নে উপভোগ করছিলাম। বান্দরবনের পুরোপুরি স্বাদ নিতে সময় দিয়ে পাশে থাকলেন এক আনসার ব্যাটালিয়ন । রাঙ্গামাটি যাওয়ার পথে -সেনাবাহিনীর ক্যান্টনমেন্ট! পার হয়ে রাঙ্গামাটি ঘুরে দেখতে গিয়ে কাটিয়ে দিলাম আরো দুটি রাত। মঙ্গলবার ভোর রাতে খাগড়াছড়ির পথে দুরন্ত গতিতে ছুটে চলার ফাঁকে দৃষ্টিগোচরে যেটুকু ধরা পড়লো তাতেই মনটা প্রশান্তিতে ভরে গেলো পাহাড়ের ভিতর সারি সারি বন বিথী বেষ্টিত অপূর্ব ছিমছাম সাজানো ক্যাম্পটি নয়নাভিরাম মুগ্ধকর! পথ এক সময় শেষ হলো।
১৫ মার্চ সকাল সাড়ে আটটায় এক আত্মীয়ের বাসায় খানিক সময় কাটিয়ে দুইটার দিকে খাগড়াছড়ির প্রাণকেন্দ্র দোয়েল চত্বরে এসে গাড়ি থেকে নামলাম। এটাই শেষ স্টপেজ। এখান থেকেই চাঁদের গাড়িতে সাজেক যেতে হবে। দীর্ঘ যাত্রা পথে এবং রাতে ঠাঁই গাড়ীতে বসে থেকে শরীর ভীষণ আড়ষ্ট হলেও ভ্রমণ পিয়াসু মনে কোন ক্লান্তির ছায়া অনুভূত হলো না।
শহরটির চারিদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। বৃহৎ শৃঙ্গগুলি যেন দূর হতে ইশারা করে, কাছে যেতে, চূড়ায় উঠতে ইচ্ছে করে। কিন্তু আলুটিলা গুহা দেখার জন্য মনটা বিশেষ ছটফট করছিলো, তাই আসার সময় চলতি পথে যতটুকু নৈসর্গিক শোভা দেখা যাচ্ছিল সেটুকু দেখেই সন্তুষ্ট হচ্ছিলাম। !
খাগড়াছড়ি হতে সাজেকের দূরত্ব সত্তুর কিলোমিটার। যদিও সাজেক রাঙামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার একটি ইউনিয়ন, তবুও শুধুমাত্র যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধার্থে খাগড়াছড়ি হয়ে যেতে হয়। সাজেককে রাঙা মাটি জেলার ছাদ বলা হয়। এত উচ্চতায় অবস্থিত যে ওখান থেকেই রাঙামাটি শহরের অনেকাংশ দেখা যায়। এর উত্তরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য দক্ষিণে রাঙামাটি জেলার লংগদু উপজেলা, পূর্বে ভারতের মিজোরাম ও পশ্চিমে খাগড়াছড়ির দিঘিনালা উপজেলা।
রাস্তার দুধারে, পাহাড়ের পাদদেশে, পাহাড়ের চূঁড়ায়, বা পাহাড়ের গায়ের ভাঁজে ভাঁজে জনবসতি। রাস্তার দু’ পাশের পাহাড়ি বাড়িগুলোর বাচ্চারা এসে পথের ধারে সারি বেধে দাড়িয়ে আছে। যে গাড়ী আসছে হাত নেড়ে বাই বাই দিচ্ছে, কোন কোন গাড়ী হতে টাকা ছুড়ে দিচ্ছে, ওরা দৌড় দিয়ে তা কুড়িয়ে নিচ্ছে আর মলিন মুখ গুলো খুশিতে ভরে যাচ্ছে। পথে যেতে কাসালং ব্রীজ ও কাসালং নদী টাইগার টিলা আর্মি পোস্ট, আর দৃষ্টি নন্দন পাহাড়ীর প্রকৃতি, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীদের বাজার, গ্রাম, দেখতে দেখতে সাজেক পৌঁছে গেলাম। মেঘের ঘর রিসোর্ট বুক করে নিলাম ।
ম্যানেজারের কাছ থেকে জানতে পারলাম, লাঞ্চ, ডিনার ইত্যাদির জন্য নাকি আগেই খাবার বুকিং দিতে হয়। তাই ডিনার বুকিং দিয়েই
ব্যাগেজ গুলো রুমে রেখেই একত্রে ভ্রমন সঙ্গী সোহাগ ,মিজান, রফিক , আবরার, নজরুল, জাহিদ,জাহাঙ্গীর, আলমগীর, আরো অনেকেই সবাই শহর দেখতে বেরিয়ে পড়লাম।
। হঠাত নিমিষেই মনে হলো কুয়াশা ঘেরা শীতের ভোরের অন্ধকারে পথে হাটছি। মনে হলো কুয়াশার ভেতর হাটছি! আবার মনে হলো মেঘের ভিতর দিয়ে হেটে চলেছি। পরক্ষণেই বুঝলাম! সত্যিই মেঘগুলো আমাদের শরীরকে ছুয়ে উড়ে যাচ্ছে। দূরে সরেযাচ্ছে কিছুতেই ধরতে পারছিনা, ছুতে পারছিনা। এখানে তিন রকম প্রাকৃতিক পরিবেশ অনুভূত হয়। একটু রোদ্দুর,গরম,আবার কুয়াশার চাদরে মোড়া ও শীতল সহনীয় সজীব অনুভুতি। আমরা
রাতে বেম্বো চিকেন দিয়ে ডিনার শেরে নিলাম। রাতে খানিক সময় ঘুমিয়ে শেষ রাতে উঠে গেলাম ফজরের নামাজ পরে সূর্য উদয় দেখালাম, মনে হলো যেন পাহাড় থেকেই বের হলো ।
সকাল সকাল কংলাক পাহাড়ের উদ্দেশ্যে গাড়ীতে চল্লাম।
গাড়ী যখন কংলাক পাহাড়ের পাদদেশ থেকে প্রায় পঞ্চাশ ফুট দুরত্বে আমাদের নামিয়ে দিলো, তখন আঠারো শত ফুট উচ্চতার পাহাড়টিকে দেখে শরীরের মধ্যে একটা ঝাঁকুনি দিলো। মনে হলো পাহাড়টি মেঘ ফুড়ে আরো উচুতে উঠে গেছে। অন্যান্য পর্যটকেরা বলাবলি করছিলো, পাহাড়ের উপরে অক্সিজেনের স্বল্পতা রয়েছে। তাই বয়স্ক ব্যক্তি ও হার্ট দূর্বল ব্যক্তির পাহাড় ট্রাকিং না করাই উচিত।
আমাদের অনেকেই দশ টাকা দিয়ে নলি বাঁশের লগি কিনে তিন পা বানিয়ে আস্তে আস্তে পাহাড়ের গা বেয়ে আমরা উঠতে লাগলাম। পাহাড়ের চূঁড়া হতে যারা নেমে আসছে তাদের সাইড দিতে গেলে ঝামেলা হচ্ছে। সামান্য এদিক ওদিক হলেই নিচে পড়ে যেতে হবে খুব সাবধানে উঠতে হচ্ছে।
অবশেষে এক সময় চূঁড়ায় পৌঁছে গেলাম। সফর সঙ্গীদের কোন চিহ্ন নেই। বিপুল মানুষের ভীড়ে খুঁজতে খুঁজতে দেখি, তারা ফটো সেশনে ব্যস্ত। সব ঘুরে দেখার পর এবার নামার পালা!
নামতে তেমন কোন কষ্ট হয়নি তবে খনিকের জন্য জাহিদ কে হাড়িয়ে আমরা সবাই টেনশনে ছিলাম
। ওখান থেকে বিজিবির হেলিপ্যাডে সবাই ঘুরতে এলাম। টিলার পরে বিশাল এলাকা নিয়ে হেলিপ্যাড! সন্ধার গোধূলিতে শিশু থেকে সকল বয়সী মানুষের কোলাহলে এলাকাটি মুখরিত হয়। পাহাড়ের টিলায় দাঁড়িয়ে গাড় লাল সূর্য মামা তার সব রঙ হারিয়ে আস্তে আস্তে মেঘের কোলে ডুবে যাওয়ার দৃশ্য দেখার সুযোগ হয়নি আগেই আমাদের চলে আসতে হয় । তবে অপূর্ব সূর্য উদয়ের দৃশ্যটি আজীবন মানসপটে স্থির চিত্র হয়ে রইবে।
১৬ মার্চ, ২০২৩। সবাই বিকালে ফুরফুরে মন নিয়ে শয্যা ত্যাগ করলাম। চান্দের গাড়ি দিয়ে খাগড়াছড়ির প্রাণকেন্দ্র দোয়েল চত্বরে এসে হাইসে করে বাড়ীর উদ্দেশ্য রওনা হলাম। ঠিক রাত চারটার দিকে আহমদ নগর নতুন বাজারে এসে পরলাম । তিন পার্বত্য জেলাতে পাহাড়িদের ঐতিহ্যবাহী বাঁশের চোঙের ভিতর রান্না করা, ভাত, মাছ মাংস, বন মোরগ, বেম্বো চিকেন শুধু নয় যে কোন ধরনের বিরিয়ানী খেয়ে না আসলে আপনার ভ্রমণে অতৃপ্তি থেকে যাবে। পাহাড়ে বেড়াতে গেলে এসব কোনো কিছুই মিস করবেন না।
