عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَنْ مَاتَ وَلَمْ يَغْزُ، وَلَمْ يُحَدِّثْ بِهِ نَفْسَهُ، مَاتَ عَلَى شُعْبَةٍ مِنْ نِفَاقٍ»
হযরত আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত। রাসূল সাঃ ইরশাদ করেছেন, যে ব্যক্তি মারা গেল, কিন্তু ইসলামী যুদ্ধ তথা জিহাদে যায়নি, কিংবা জিহাদে যাওয়ার ইচ্ছেও অন্তরে পোষণ করেনি, সে এক প্রকার মুনাফিকীর [অবস্থায়] মৃত্যুবরণ করল।
اِنَّ اللّٰہَ اشۡتَرٰی مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اَنۡفُسَہُمۡ وَاَمۡوَالَہُمۡ بِاَنَّ لَہُمُ الۡجَنَّۃَ ؕ یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ فَیَقۡتُلُوۡنَ وَیُقۡتَلُوۡنَ ۟ وَعۡدًا عَلَیۡہِ حَقًّا فِی التَّوۡرٰىۃِ وَالۡاِنۡجِیۡلِ وَالۡقُرۡاٰنِ ؕ وَمَنۡ اَوۡفٰی بِعَہۡدِہٖ مِنَ اللّٰہِ فَاسۡتَبۡشِرُوۡا بِبَیۡعِکُمُ الَّذِیۡ بَایَعۡتُمۡ بِہٖ ؕ وَذٰلِکَ ہُوَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ
বস্তুত আল্লাহ মুমিনদের কাছ থেকে তাদের জীবন ও তাদের সম্পদ খরিদ করে নিয়েছেন, তাদের জন্য জান্নাত আছে-এর বিনিময়ে। তারা আল্লাহর পথে যুদ্ধ করে। ফলে হত্যা করে ও নিহতও হয়। এটা এক সত্য প্রতিশ্রুতি, যার দায়িত্ব আল্লাহ তাওরাত ও ইনজীলেও নিয়েছেন এবং কুরআনেও। আল্লাহ অপেক্ষা বেশি প্রতিশ্রুতি রক্ষাকারী আর কে আছে? সুতরাং তোমরা আল্লাহর সঙ্গে যে সওদা করেছ, সেই সওদার জন্য তোমরা আনন্দিত হও এবং এটাই মহা সাফল্য।
يُجَٰهِدُونَ فِي سَبِيلِ ٱللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوۡمَةَ لَآئِمٖۚ
“তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে এবং কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না।
« الْقَتْلُ فِى سَبِيلِ اللَّهِ يُكَفِّرُ كُلَّ شَىْءٍ إِلاَّ الدَّيْنَ »
“আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হওয়া ঋণ ছাড়া সব কিছু মাফ করিয়ে দেয়।
وَمَنْ جَاهَدَ فَإِنَّمَا يُجَاهِدُ لِنَفْسِه إِنَّ اللّٰهَ لَغَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ
’’আর যে ব্যক্তি সাধনা (জিহাদ) করে, সে তো নিজেরই জন্য সাধনা করে। আল্লাহ্ তো বিশ্বজগত থেকে অমুখাপেক্ষী।’’
انْفِرُوا خِفَافًا وَثِقَالًا وَجَاهِدُوا بِأَمْوَالِكُمْ وَأَنْفُسِكُمْ فِي سَبِيلِ اللهِ ذٰلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ
’’তোমরা অভিযানে বের হয়ে পড়, হালকা অথবা ভারী অবস্থায়; এবং জিহাদ করো আল্লাহর পথে নিজেদের মাল দিয়ে এবং নিজেদের জান দিয়ে। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা জানতে।’’
وَلَا تَحْسَبَنَّ ٱلَّذِينَ قُتِلُواْ فِى سَبِيلِ ٱللّٰهِ أَمْوَاتاً بَلْ أَحْيَاءٌ عِندَ رَبِّهِمْ يُرْزَقُونَ
’’আর যারা আল্লার পথে শহীদ হয়, তাদেরকে তুমি মৃত মনে করো না। বরং তারা নিজেদের পালনকর্তার নিকট জীবিত ও জীবিকাপ্রাপ্ত’’
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ، قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ـ صلى الله عليه وسلم ـ “ أَفْضَلُ الْجِهَادِ كَلِمَةُ عَدْلٍ عِنْدَ سُلْطَانٍ جَائِرٍ
আবূ সাঈদ আল-খুদরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ যালেম শাসকের সামনে সত্য কথা বলা অধিক উত্তম
قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «مَثَلُ الْمُجَاهِدِ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ الصَّائِمِ الْقَائِمِ الْقَانِتِ بِآيَاتِ اللَّهِ لَا يَفْتُرُ مِنْ صِيَامٍ وَلَا صَلَاةٍ حَتَّى يَرْجِعَ الْمُجَاهِدُ فِي سَبِيلِ اللَّهِ
আবূ হুরায়রাহ্ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে মুজাহিদদের তুলনা ঐরূপ সায়িমের (রোযাদারের) ও সালাত আদায়রত অবস্থায় তিলাওয়াতকারীর ন্যায়, যে ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় মুজাহিদের ঘরে ফিরে না আসা পর্যন্ত সিয়াম পালনে ও সালাত আদায়ে নিমগ্ন থাকে।
وَعَنْ سَهْلِ بْنِ سَعْدٍ قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «رِبَاطُ يَوْمٍ فِي سَبِيلِ اللَّهِ خَيْرٌ مِنَ الدُّنْيَا وَمَا عَلَيْهَا
সাহল ইবনু সা’দ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ আল্লাহর পথে এক দিনের সীমান্ত পাহারা দেয়া, দুনিয়া ও দুনিয়াতে যা কিছু আছে (তার থেকে) সর্বাপেক্ষা উত্তম।
একটি সংশয়ঃ আমাদের দেশে এখনও জিহাদ ফরজে আইন হয়নি
জিহাদের ক্ষেত্রে সংশয় সন্দেহ সৃষ্টিকারী একদল আলিম অনেক সময় এমন কথা বলেন যে, আমাদের ভূখন্ডে বা আমাদের দেশে যেহেতু কাফির শত্রুরা আক্রমণ করেনি সেহেতু আমাদের উপর জিহাদ এখনও ফরজে আইন হয়নি। যে সকল মুসলিম ভূখন্ডে কাফিররা আক্রমণ করেছে এবং মুসলিম জনসাধারণের উপর জুলুম নির্যাতন করছে সে সকল মুসলিমদের উপর জিহাদ ফরজে আইন। যারা এ ধরনের কথা বলেন তাদের জেনে রাখা উচিত যে, কোন ভূখন্ডে যখন শত্রুরা আক্রমণ করে এবং উক্ত ভূখন্ডের মুসলিমরা শত্রুদের প্রতিরোধ করতে সক্ষম না হয়, তখন জিহাদ পর্যায়ক্রমে তার পার্শ্ববর্তী ভূখন্ডের মুসলিমদের উপর ফরজে আইন হয়ে যায়।
১) শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, যদি শত্রুরা মুসলিম ভূমিতে প্রবেশ করে তখন ক্রমানুসারে নিকটবর্তীদের উপর জিহাদ ওয়াজিব হয়ে যায়। কেননা সকল মুসলিম ভূখন্ড একটি ভূখন্ডের ন্যায়। [আল ফাতাওয়া আল কুবরা, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৬০৮]
২) আল্লামা ইবনে আবেদিন আশ শামি রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ যদি শত্রুরা মুসলিমদের কোন সীমানায় আক্রমণ চালায়, তাহলে তার নিকটবর্তী যুদ্ধে সক্ষম মুসলিমদের উপর জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়। যদি তাদের সাহায্যের প্রয়োজন না হয়, তাহলে আক্রান্ত এলাকা থেকে যারা দূরে অবস্থান করছে তাদের উপর ফরজে কিফায়া। তবে শত্রুর নিকটে যারা রয়েছে তারা যদি শত্রুকে প্রতিরোধ করতে অপারগ হয়, অথবা অপারগ না হয় কিন্তু অলসতাবশত জিহাদ ত্যাগ করে, তাহলে তাদের পার্শ্ববর্তীদের উপর নামাজ ও রোজার ন্যায় জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়, যা ছেড়ে দেওয়া বৈধ নয়। এভাবে ক্রমানুসারে পূর্ব পশ্চিমের সকল মুসলিমদের উপর জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়। [হাশিয়ায়ে ইবনে আবেদিন, খন্ড ৩, পৃষ্ঠা ২৩৮]
৩) আল্লামা ইবনু নুজাইম আল মিসরি রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ এখানে উদ্দেশ্য হলো কোন একটি নির্দিষ্ট মুসলিম ভূখন্ডে (কাফিরদের) আক্রমণ। তাহলেই সে দেশের সকল মানুষের উপর (জিহাদ) ওয়াজিব হয়ে যাবে। যদি তারা যথেষ্ট না হয় তাহলে তাদের পার্শ্ববর্তীদের উপর একই হুকুম বর্তাবে। যদি তাদের পার্শ্ববর্তী মুসলিমরাও যথেষ্ট না হয় অথবা অলসতাবশত অল্লাহর নাফরমানি করে তাহলে তাদের পার্শ্ববর্তীদের উপর এই হুকুম বর্তাবে। ক্রমানুসারে পূর্ব পশ্চিমের সকল মুসলিমদের উপর এই ওয়াজিব ব্যাপকতা লাভ করবে। [বাহরূর রায়েক, খন্ড ১৩, পৃষ্ঠা ২৮৯]
এখন প্রশ্ন হলো, ভারতের হিন্দু কাফিরদের জুলুম নির্যাতন প্রতিরোধ করার পরিপূর্ণ সক্ষমতা কি কাশ্মীরের মুসলিমদের রয়েছে? মিয়ানমারের বৌদ্ধ জালিমদের নির্মম হত্যাকান্ডের প্রতিশোধ কি আরাকানের মুসলিমরা গ্রহণ করতে পেরেছে? ইসরাঈলের আগ্রাসী ইহুদিদের আক্রমণ কি ফিলিস্তিনের মুসলিমরা প্রতিহত করতে সক্ষম হয়েছে? মুসলিমদের আন্দালুস কি স্পেনের খ্রিষ্টানদের নিকট থেকে পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে?
এ সকল প্রশ্নের উত্তর যদি না হয়, তাহলে নামধারী আলিমরা কিভাবে বলেন যে, আমাদের দেশে এখনও জিহাদ ফরজে আইন হয়নি? আমাদের মুসলিম ভাইয়েরা যখন কাফিরদের আক্রমণ প্রতিরোধ করতে সক্ষম হচ্ছেন না, তখন পার্শ্ববর্তী ভূখন্ডের মুসলিম হিসাবে আমাদের উপর কি জিহাদের দায়িত্ব অর্পিত হচ্ছে না? বরং উপরোক্ত ইমামদের ফাতওয়া অনুযায়ী পৃথিবীর পূর্ব পশ্চিমের সকল মুসলিমদের উপর আজ জিহাদ ফরজে আইন হয়ে গেছে। তাই এ ক্ষেত্রে সংশয় সন্দেহ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকুন।
মুসলিমদের কোন ভূখণ্ড কাফিররা দখল করে নিলে তা পুনরুদ্ধার করা ফরজ
মুসলিমদের কোন ভূখণ্ড যদি কাফিররা দখল করে ফেলে তাহলে জিহাদের মাধ্যমে তা পুনরুদ্ধার করা মুসলিমদের উপর ফরজ। যতক্ষণ পর্যন্ত উক্ত কাফিরদেরকে পরাজিত ও প্রতিহত করে মুসলিমদের জান মালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ করা ফরজ।
ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ কোন কোন অবস্থায় সকলের উপরই জিহাদে বের হওয়া ফরজ হয়ে যায়। চতুর্থ মাসআলায় এটিই বর্ণনা করা উদ্দেশ্য। উক্ত অবস্থা হলো যখন কোন (মুসলিম) ভূখণ্ডে শত্রু দখলদারিত্ব কায়েম করে ফেলার কারণে বা কোনো ভূখণ্ডে শত্রু ঢুকে পড়ার কারণে জিহাদ ফরজে আইন হয়ে যায়….। যদি এমন হয় যে, শত্রুরা দারুল ইসলামের (অর্থাৎ ইসলামি ভূখণ্ডের) নিকটবর্তী হয়ে গেছে কিন্তু এখনও দারুল ইসলামে আগ্রাসন চালায় নি, তাহলেও তাদের উপর ফরজ শত্রু প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়া। যাতে আল্লাহর দ্বীন বিজয়ী থাকে, ইসলামি ভূখণ্ড সংরক্ষিত থাকে এবং শত্রু অপদস্থ ও পরাজিত হয়। এ বিষয়ে কারো কোন দ্বিমত নেই। [তাফসিরে কুরতুবি, ৮/১৫১-১৫২]
কাজি ইয়ায রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ হাদিসের বাণী “যখন তোমাদেরকে জিহাদে বের হতে আহ্বান করা হবে, তোমরা বের হয়ে পড়ো” এর দুটি সুরত।
১) যদি এমন কোন শত্রু প্রতিহত করতে আহ্বান করা হয়, যারা মুসলিমদের কোন ভূখণ্ডে আক্রমণ করেছে তাহলে তাদেরকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে জিহাদে বের হওয়া তাদের উপর ফরজে আইন।
২) একইভাবে যে শত্রু দখলদারিত্ব কায়েম করে ফেলেছে তাদেরকে প্রতিহত করার জন্যে জিহাদে বের হওয়াও ফরজে আইন। এ ফরজ বলবৎ থাকবে, যতক্ষণ না শত্রু পরাজিত হয়।
এই দুই সুরত ছাড়াও ইমাম যদি জিহাদে বের হওয়ার আদেশ দেন, তবুও ইমামের আনুগত্যের ভিত্তিতে জিহাদে বের হওয়া আবশ্যক। তবে এটি পূর্বোক্ত দুটির মতো জোরদার ফরজ নয়। [ইকমালুল মুলিম, ৬/২৭৫]
ইমাম কুরতুবি রহিমাহুল্লাহ ও কাজি ইয়ায রহিমাহুল্লাহ এর বক্তব্য এ বিষয়ে অত্যন্ত সুস্পষ্ট যে, শত্রুদল কোন মুসলিম ভূখণ্ড দখল করে নিলে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরজ, যতক্ষণ না শত্রুদল পরাজিত হয় এবং মুসলিম ভূমি পুনরুদ্ধার হয়। যেমনিভাবে শত্রুদল মুসলিম ভূখণ্ডের দিকে অগ্রসর হলে বা আক্রমণ চালালে তা প্রতিহত করার জন্য জিহাদ করা ফরজ।
যে ব্যক্তি কাফির মুশরিক অবস্থায় মারা যায় তার জন্য দোয়া করা হারাম
কোন ব্যক্তি কাফির মুশরিক অবস্থায় মারা গেলে তার জন্য দোয়া করা নাজায়েজ। এরূপ ব্যক্তির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা, পরকালীন শান্তি কামনা করা, তার জন্য আল্লাহ তায়ালার রহমত প্রার্থনা করা, জান্নাত নসীবের দোয়া করা এগুলো সবই সুস্পষ্ট হারাম কাজ।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ নবী ও মুমিনদের জন্য উচিত নয় যে, তারা মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করবে, যদিও তারা আত্মীয় হয়। তাদের নিকট এটি স্পষ্ট হয়ে যাওয়ার পর যে, নিশ্চয়ই তারা প্রজ্বলিত আগুনের অধিবাসী। [সূরা তওবা, আয়াত ১১৩]
নবী ﷺ এর চাচা আবু তালিব মুশরিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করার পর নবী ﷺ বললেনঃ যতক্ষণ আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে নিষেধ না করা হবে, ততক্ষণ আমি আপনার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করতে থাকবো। তখন উক্ত আয়াতটি অবতীর্ণ হলো, যাতে মুশরিকদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বলেনঃ পক্ষান্তরে কাফিরের জন্য রহমত প্রার্থনা করা, ক্ষমা প্রার্থনা করা, এটি কুরআনের দলিল ও ইজমার ভিত্তিতে হারাম। [আল মাজমু এর ৫/১২০]
কিয়ামতের দিন কোন কাফির মুশরিক জান্নাতে যেতে পারবে না
ইসলামের মৌলিক একটি আকিদা হলো, জান্নাতের যাওয়ার জন্য ঈমান পূর্বশর্ত। সুতরাং কোন কাফির মুশরিক কিয়ামতের দিন জান্নাতে যেতে পারবে না। তারা চিরকাল স্থায়ীভাবে জাহান্নামের আযাব ভোগ করতে থাকবে।
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ আহলে কিতাব (অর্থাৎ ইহুদি খ্রিষ্টান) ও মুশরিকদের মধ্যে যারা কাফির, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে থাকবে। তারাই সৃষ্টির অধম। [সূরা বাইয়্যিনা, আয়াত ৬]
সহীহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে এসেছেঃ এরপর রাসূলুল্লাহ বিলালকে নির্দেশ দিলেন। তাই তিনি লোকদের মাঝে ঘোষণা দিলেন, জান্নাতে কেবল মুসলিম ব্যক্তিই প্রবেশ করবে। [সহীহ বুখারী, হাদিস নং ২৮৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১৬৬]
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা ঈমানদার হতে পারবে না। [সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ৮৪; আবু দাউদ, হাদিস নং ৫১৯৩]
আল্লাহ তায়ালা বলেনঃ নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। আর যে লোক আল্লাহর সাথে অংশীদার সাব্যস্ত করলো, সে যেন অপবাদ আরোপ করলো। [সূরা নিসা, আয়াত ৪৮]
তাফসীরে খাযীনে বলা হয়েছেঃ আয়াতের মর্মার্থ হলো, নিশ্চয়ই আল্লাহ ঐ মুশরিককে ক্ষমা করেন না, যে শিরকের উপর মারা গিয়েছে। তিনি শিরকের চাইতে নিম্ন পর্যায়ের গুনাহ গুনাহগারদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা ক্ষমা করেন। উক্ত আয়াত প্রমাণ করে যে, গুনাহগার ব্যক্তি তাওবা ছাড়া মারা গেলে তার বিষয়টি আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে তাকে ক্ষমা করে দিবেন এবং দয়া করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, আর চাইলে তাকে শাস্তিও দিতে পারেন এবং অবশেষে দয়া করে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। আল্লাহর পক্ষ থেকে ক্ষমার প্রতিশ্রুতি শুধুমাত্র শিরক থেকে নিম্ন পর্যায়ের গুনাহর জন্য। সুতরাং কোন ব্যক্তি শিরকের সঙ্গে মারা গেলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামি হবে। কেননা আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে লোক তাঁর সাথে শরীক করে। তিনি ক্ষমা করেন এর নিম্ন পর্যায়ের পাপ, যার জন্য তিনি ইচ্ছা করেন। [তাফসীরে খাযীন, ১/৩৮৭]
জিহাদে বের হওয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছু হতে উত্তম
আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ
দিনের প্রথমার্ধে বা শেষার্ধে আল্লাহর পথে (জিহাদে) বের হওয়া দুনিয়া ও দুনিয়ার সবকিছু হতে উত্তম।
সূত্রঃ কিতাবুল জিহাদ, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রচিত, পৃষ্ঠা ৯৩, হাদিস নং ১৮
ভোরে জিহাদের জন্য যাত্রা করার ফজিলত
হাসান (রাদিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) একটি বাহিনী প্রেরণ করলেন, যাতে আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহাও ছিলেন। বাহিনী ভোরে রওয়ানা হয়ে গেল। কিন্তু আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর সাথে নামাজে উপস্থিত হওয়ার জন্য থেকে গেলেন।
যখন রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এর নামাজ সমাপ্ত হলো, তখন তিনি (তাকে দেখে) বললেনঃ হে ইবনে রাওয়াহা, তুমি কি ঐ বাহিনীতে ছিলে না? তিনি বললেনঃ ছিলাম ইয়া রাসূলাল্লাহ। কিন্তু আমার ইচ্ছা হলো আপনার সাথে এই নামাজে উপস্থিত থাকি। আমি তাদের মঞ্জিল জানি। বিকালে রওয়ানা হয়ে যাবো এবং তাদের সঙ্গে মিলিত হবো।
(তখন রাসূলুল্লাহ) বললেনঃ ঐ সত্ত্বার কসম যার হাতে আমার প্রাণ, যদি তুমি জমিনের সকল কিছু আল্লাহর পথে ব্যয় করে ফেলো, তবুও তাদের ভোরের যাত্রার মর্যাদা লাভ করতে পারবে না।
সূত্রঃ কিতাবুল জিহাদ, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রচিত, পৃষ্ঠা ৯১, হাদিস নং ১৪
মুজাহিদের ফজিলত সিয়াম ও সালাত আদায়কারীর ন্যায়
আবু হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেনঃ
আল্লাহর পথে জিহাদকারী ঐ ব্যক্তির ন্যায় যে সিয়াম পালন করে এবং দিন রাতের মুহূর্তগুলোতে আল্লাহর আয়াতসমূহ নিয়ে (সালাতে) এই খুঁটির মত দন্ডায়মান থাকে।
সূত্রঃ কিতাবুল জিহাদ, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রচিত, পৃষ্ঠা ৯০, হাদিস নং ১৩
আল্লাহ তায়ালার নিকট সর্বাধিক প্রিয় আমল
আবু সালেহ বলেছেন, তাঁরা আলোচনা করলেন, যদি আমরা জানতাম কোন আমলটি সর্বোত্তম বা আল্লাহ তায়ালার নিকট অধিক পছন্দনীয়। তখন অবতীর্ণ হলোঃ
হে মুমিনগণ, আমি কি তোমাদেরকে এমন এক ব্যবসার সন্ধান দিব, যা তোমাদেরকে রক্ষা করবে মর্মন্তুদ শাস্তি হতে? তা এই যে, তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলে বিশ্বাস স্থাপন করবে এবং তোমাদের জান মাল দ্বারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে।
তাঁরা এটিকে কষ্টের ব্যাপার মনে করলেন। তখন অবতীর্ণ হলোঃ
হে মুমিনগণ, তোমরা যা করো না তা তোমরা কেন বলো? তোমরা যা করো না তোমাদের তা বলা আল্লাহর দৃষ্টিতে খুবই অসন্তোষজনক।
সূত্রঃ কিতাবুল জিহাদ, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রচিত, পৃষ্ঠা ৮১, হাদিস নং ২
ধেয়ে আসছে গাজওয়াতুল হিন্দ!
পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় যে ধর্মযুদ্ধ হবে সেটাই হল "গাজওয়ায়ে হিন্দ" তথা হিন্দুস্থান ভারতের বিরুদ্ধে মুসলমান উম্মাহদের যুদ্ধ। এই সম্মানিত যুদ্ধে নিশ্চিত মুসলমান উম্মাহরা বিজয় লাভ করবেন। সুবহানআল্লাহ.!
কিন্তু এই সম্মানিত যুদ্ধে এক তৃতীয়াংশ মুসলমান শাহাদাত বরন করবেন এবং শেষাংশ যুদ্ধ শেষ করে বিজয় লাভ করবেন। সুবহানাল্লআহ.!
যারা এই সম্মানিত যুদ্ধে শাহাদাত বরন করবেন উনারা নিশ্চিত জান্নাতবাসী হবেন। সুবহানআল্লাহ.! এবং যেসব মুসলমানগন এই সম্মানিত যুদ্ধে বিজয়ী হয়ে গাজী হয়ে ফিরবেন উনারা ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরন করে জান্নাতবাসী হবেন। সুবহানআল্লাহ.!
আবার এই সম্মানিত যুদ্ধ থেকে যেসব নামধারী মুসলমানরা পালিয়ে যাবে তারা বেইমান হয়ে মৃত্যুবরন করবে। নাউজুবিল্লাহ!
পবিত্র হাদিস শরীফে গাজওয়াতুল হিন্দ সম্পর্কে বলা হয়েছে, এটা হবে কাফির মুশরিকদের সাথে মুসলমানদের পৃথিবীর ভিতর বৃহত্তম জি"হ|দ/যুদ্ধ। এই যুদ্ধে হিন্দুস্তানের মোট মুসলিমদের এক তৃতীয়াংশই শহীদ হবে, আরেক অংশ পালিয়ে যাবে আর শেষ অংশ
জি"হ|দ চালিয়ে যাবে।
মুসলমানদের নিশ্চিত জয় হবে কিন্তু এটা এতোটাই ভয়াবহ যে হয়তো অল্প কিছু সংখ্যক মুসলিমই বেঁচে থাকবেন বিজয়ের খোশ আমদেদ করার জন্য।
অন্য বর্ণনায় আছে,
গাজওয়াতুল হিন্দ হিন্দুস্তানের (চুড়ান্ত) যুদ্ধ। রাসুল (ﷺ) একদিন পুর্ব দিকে তাকিয়ে বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছিলেন, এমন সময় এক সাহাবি রাসুল (ﷺ) কে জিজ্ঞেস করলেন, "ইয়া রাসুলুল্লাহ (ﷺ) আপনি এমন করছেন কেন!"
রাসুল (ﷺ) বললেন, "আমি পুর্ব দিকে বিজয়ের গন্ধ পাচ্ছি।" সাহাবায়ে কেরাম রাদিআল্লাহু তাআ'লা আনহুম উনারা জিজ্ঞেস করলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ(ﷺ) আপনি কিসের বিজয়ের গন্ধ পাচ্ছেন? রাসুল (ﷺ) বললেন, পুর্ব দিকে মুসলিম ও মুশরিকদের (যারা মুর্তিপুজা করেন) সাথে যুদ্ধ শুরু হবে। যুদ্ধটা হবে অসম। মুসলিম সেনাবাহিনী থাকবে সংখ্যায় সীমিত, কিন্তু মুশরিক সেনাবিহিনী থাকবে সংখ্যায় অধিক।
ঐ যুদ্ধে মুসলিমরা এত বেশি মারা যাবে যে রক্তে মুসলিমদের পায়ের টাকুনি পর্যন্ত ডুবে যাবে। ঐ যুদ্ধে মুসলিমরা তিন ভাগে বিভক্ত থাকবে; এক ভাগ বিশাল মুশরিক বাহিনি দেখে ভয়ে পালিয়ে যাবে, তারাই হলো জাহান্নামী! আর এক ভাগ সবাই যুদ্ধে শহীদ হবেন। শেষ ভাগ আল্লাহর ওপর ভরসা করে যুদ্ধ চালিয়ে যাবে এবং শেষ পর্যন্ত জয় লাভ করবেন।
রসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, এই যুদ্ধ বদর যুদ্ধের সমতুল্য!(সুবহানাল্লাহ)
তিনি আরো বলেছেন, ঐ সময় মুসলিমরা যে যেখানেই থাকুক না কেন তারা যেন সেই যুদ্ধে শরিক হন।
নাসায়ী খন্ড ০১,পৃষ্টা ১৫২
সুনানে আবু দাউদ খন্ড ০৬,পৃষ্টা ৪২
এই যুদ্ধে আমাদের শামিল হওয়ার
তাওফিক দিও আল্লাহ
প্রশ্ন (১/৪১) : ‘গাযওয়াতুল হিন্দ’ নামে এক যুদ্ধের কথা কোন কোন বক্তা প্রচার করে থাকেন। উক্ত যুদ্ধের সত্যতা ও বিবরণ সম্পর্কে জানতে চাই। এছাড়া আরেক শতাব্দী পর মুসলমানরা ইসলামী খেলাফত ফিরে পাবে মর্মে কোন ভবিষ্যদ্বাণী আছে কি?
উত্তর : ‘গাযওয়াতুল হিন্দ’ নামে এক যুদ্ধের বর্ণনা বিভিন্ন হাদীছে রয়েছে, যার মধ্যে একটিমাত্র ছহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। যেমন ছাওবান (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের দু’টি দল রয়েছে যাদেরকে আল্লাহ তা‘আলা জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন। তাদের একটি দল হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে লড়াই করবে। আরেকটি দল যারা ঈসা (আঃ)-এর পক্ষে থাকবে’ (নাসাঈ হা/৩১৭৫; আহমাদ হা/২২৪৪৯; ছহীহাহ হা/১৯৩৪)। উপরোক্ত হাদীছে হিন্দুস্থানের যে যুদ্ধে বিজয়ের ভবিষ্যদ্বাণী রাসূল (ছাঃ) করেছিলেন, তা ইতিমধ্যে ঘটে গেছে। কেননা মুসলমানগণ হিন্দুস্থানে বেশ কয়েকবার অভিযান পরিচালনা করেছেন। যেমন ওমর (রাঃ)-এর খেলাফতকালে সর্বপ্রথম ১৫ হিজরীতে ওছমান বিন আবুল ‘আছের নেতৃত্বে একটি সেনাদল প্রেরিত হয়। যারা হিন্দুস্থানের থানা, ব্রূছ ও দেবল বন্দরে সফল অভিযান পরিচালনা করেন। থানাকে বর্তমানে মুম্বাই, ব্রূছকে গুজরাট এবং দেবলকে করাচী বলা হয়। তারা এ সময় ‘সরনদীব’ জয় করেন। যাকে বর্তমানে শ্রীলঙ্কা বলা হয় (আতহার মুবারকপুরী, আল-ইক্বদুছ ছামীন ফী ফুতূহিল হিন্দ (কায়রো : দারুল আনছার, ২য় সংস্করণ ১৩৯৯ হি./১৯৭৯) ১/২৬, ৪০, ৪২, ৪৪)। অতঃপর মু‘আবিয়া (রাঃ)-এর খেলাফতকালে (৪১-৬০ হি.) হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালিত হয় (আল-বিদায়াহ ৬/২২৩)। এরপর ৯৩ হিজরীতে খলীফা ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিকের আমলে (৮৬-৯৬ হি.) মুহাম্মাদ বিন কাসেম ছাক্বাফী-র নেতৃত্বে সিন্ধু ও হিন্দুস্থান বিজিত হয় (আল-বিদায়াহ ৯/৭৭, ৯৫; আল-ইক্বদুছ ছামীন ১/১৪১-৪২)। এছাড়া ৫ম শতাব্দী হিজরীর প্রথম দিকে গযনীর সুলতান মাহমূদ (৩৮৮-৪২১ হি.) হিন্দুস্থানের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযান পরিচালনা করেন। তিনি ভারতের বিখ্যাত সোমনাথ মন্দিরে প্রবেশ করে সকল মূর্তি ভেঙ্গে চুরমার করেন। অতঃপর বিজয়ী হয়ে ফিরে আসেন (আল-বিদায়াহ ৬/২২৩, ১২/৩০; আহলেহাদীছ আন্দোলন ২০৬-২০৮ পৃ.)।
অপরপক্ষে হযরত আবু হুরায়রাহ, কা‘ব ও ছাফওয়ান বিন ‘আমর (রাঃ) থেকে দুর্বল সূত্রে এ বিষয়ে কিছু হাদীছ বর্ণিত হয়েছে যে, ‘হিন্দুস্থানের নেতাদেরকে মুসলিম সেনারা বেড়ীবদ্ধ অবস্থায় শামে নিয়ে যাবে। অতঃপর ঈসা (আঃ)-এর সাথে সাক্ষাৎ করবে’। যেগুলির সবই যঈফ (নাসাঈ হা/৩১৭৩-৭৪; আহমাদ হা/৭১২৮; হাকেম হা/৬১১; নু‘আঈম বিন হাম্মাদ, আল-ফিতান হা/১২০২, ১২১৫, ১২৩৬)। এসকল যঈফ বর্ণনা থেকে অনেকে ধারণা করেন যে, এই গাযওয়াতুল হিন্দ ক্বিয়ামতের পূর্বকালে সংঘটিত হবে। দ্বিতীয়ত, ক্বিয়ামতের পূর্বে ইমাম মাহদীর মাধ্যমে ইসলামী খেলাফত পুনরায় প্রতিষ্ঠিত হবে এবং যা সাত বছর অব্যাহত থাকবে-মর্মে রাসূল (ছাঃ)-এর ভবিষ্যদ্বাণী রয়েছে (আবূদাঊদ হা/৪২৮৪-৮৫; মিশকাত হা/৫৪৫৩-৫৪; ছহীহাহ হা/১৫২৯)। তবে সেই খেলাফত এখন থেকে এক শতাব্দীকাল পর প্রতিষ্ঠিত হবে, এমন কোন সময়সীমা নির্দিষ্ট করার সুযোগ নেই।
অধিকাংশ যুদ্ধ সমূহ ছিল আক্রমণাত্মক এবং প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ ছিল কম।
সাহাবীদের যুগেও আক্রমণাত্মক জিহাদের মাধ্যমেই ইরাক, পারস্য, শাম, মিশর ও উত্তর আফ্রিকা বিজয় হয়েছে। দ্বিতীয় খলিফা উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু এর খিলাফতকালে সংঘটিত সকল যুদ্ধই ছিল আক্রমণাত্মক। তাই আক্রমণাত্মক জিহাদের বিষয়ে সাহাবীদের ইজমাও সুস্পষ্ট। স্পেন, ভারতবর্ষ, এমন কি বাংলাদেশও সাহাবীদের পরবর্তী যুগের আক্রমণাত্মক জিহাদের মাধ্যমেই ইসলামের পতাকাতলে এসেছিল। খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর আক্রমণাত্মক জিহাদের যাত্রা আবারও সত্যিকার অর্থে শুরু হবে ইনশা আল্লাহ। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে ইসলামের পতাকা উড়বে ইনশা আল্লাহ।
রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেনঃ “যে ব্যক্তি জিহাদ না করে বা জিহাদের কামনা পোষণ না করে মারা যায়, সে মুনাফিকীর অংশ বিশেষের সঙ্গে যুক্ত হয়ে মারা যাবে”। [বুলুগুল মারাম, হাদিস নং ১২৫৯, হাদিসের মানঃ সহীহ]
নবিজী বলেছেন, আল্লাহ তাআলা আশ্চর্যান্বিত হন এবং হাসেন ।
«عَجِبَ رَبُّنَا مِنْ قُنُوطِ عِبَادِهِ وَقُرْبِ غِيَرِهِ يَنْظُرُ إِلَيْكُمْ آزِلِينَ قَنِطِينَ فَيَظَلُّ يَضْحَكُ يَعْلَمُ أَنَّ فَرَجَكُمْ قَرِيبٌ»
‘‘আমাদের রব তাঁর বান্দাদের নিরাশ হওয়াতে এবং তিনি যে তাদের অবস্থা অচিরেই পরিবর্তন করে দিবেন তাতে আশ্চর্যবোধ করেন। তোমরা অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ, সংকীর্ণতা এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে দেখেন। এ অবস্থায় তিনি হাসতে থাকেন। তিনি জানেন যে, তোমাদের বিপদ মুক্তি, আরাম-আয়েশ ও সুখ-শান্তির সময় অতি নিকটে। এ হাদীছটি হাসান।
ব্যাখ্যা: عَجِبَ رَبُّنَا আমাদের রব আশ্চর্যবোধ করেনঃ অভিধানগ্রন্থ ‘আলমিসবাহ’ নামক কিতাবে রয়েছে, তাজ্জব দুই প্রকার বিষয় ও বস্ত্ত থেকে হতে পারে। (১) এমন বিষয় ও বস্ত্ত থেকে আশ্চর্যবোধ হয়, যাতে আশ্চর্যবোধকারী ঐ বস্ত্ত বা বিষয়ের প্রশংসা করে। এই প্রকার আশ্চর্যবোধের মধ্যে আশ্চর্যবোধকারী বিষয়টিকে সুন্দর ও ভাল মনে করে এবং তার প্রতি নিজের সন্তুষ্টির কথা জানায়। (২) এমন বিষয় হতে আশ্চর্যবোধ করা হয়, যাকে আশ্চর্যবোধকারী অপছন্দ করে। এই প্রকার আশ্চর্যবোধের মধ্যে আশ্চর্যবোধকারী কোন বিষয়ের প্রতিবাদ করে এবং উহার নিন্দা করে।
مِنْ قُنُوطِ عِبَادِهِ তাঁর বান্দাদের নিরাশ হওয়া থেকেঃ কোন জিনিষ হতে একেবারে নিরাশ হয়ে যাওয়াকে قنوط বলা হয়। তবে এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে বৃষ্টি বর্ষণ হওয়া এবং অনাবৃষ্টির অপকারিতা বিদূরিত হওয়া থেকে নিরাশ হওয়া।
وَقُرْبِ غِيَرِهِ অচিরেই অবস্থার পরিবর্তন হওয়াঃ غيره শব্দের গাইন বর্ণে যের দিয়ে এবং ইয়া বর্ণে যবর দিয়ে পড়তে হবে। অর্থাৎ কঠিন অবস্থাকে ভাল অবস্থার মাধ্যমে পরিবর্তন করা।
يَنْظُرُ إِلَيْكُمْ آزِلِينَ তোমরা অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ, সংকীর্ণতা এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ থাকা অবস্থায় আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে দেখেনঃ الأزل থেকে آزلين শব্দটি গঠন করা হয়েছে। الأزل -এর যা বর্ণে সাকীন দিয়ে পড়তে হবে। এর অর্থ হচ্ছে সংকীর্ণতা ও নিরাশায় নিপতিত হওয়া। বলা হয়ে থাকে أزل يأزل أزلا অর্থাৎ অনাবৃষ্টি, দুর্ভিক্ষ এবং অভাব-অনটনে নিপতিত হয়েছে।
فَيَظَلُّ يَضْحَكُ তিনি হাসতে থাকেনঃ এটি আল্লাহ তাআলার ঐ সমস্ত সিফাতে ফেলিয়াসমূহের (কর্মগত বিশেষণসমূহের) মধ্যে গণ্য, যা মাখলুকের কোন সিফাতের মত নয়। সুতরাং এই হাদীছে আল্লাহ তাআলার কর্ম সম্পর্কিত সিফাতসমূহ থেকে দু’টি সিফাত সাব্যস্ত করা হয়েছে। সিফাত দু’টি হচ্ছে আশ্চর্যান্বিত হওয়া এবং হাসা। আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য শোভনীয় পদ্ধতিতেই এই দু’টি সিফাত তাঁর জন্য সাব্যস্ত করতে হবে। আল্লাহর আশ্চর্যান্বিত হওয়া এবং হাসা মাখলুকের আশ্চর্যবোধ করা ও হাসার মত নয়। হাদীছে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার জন্য নযর তথা দৃষ্টিও সাব্যস্ত করা হয়েছে। এটিও আল্লাহর কর্মগত সিফাতের অন্তর্ভূক্ত। তিনি তাঁর বান্দাদের প্রতি দৃষ্টি দেন। আসমান ও যমীনের কোন কিছুই আল্লাহ তাআলার নিকট গোপন নয়।
‘‘আল্লাহ তাআলা এমন দু’জন লোকের প্রতি হাসেন, যাদের একজন অন্যজনকে হত্যা করে। অতঃপর তারা উভয়েই জান্নাতে প্রবেশ করে।[2]
ব্যাখ্যা: হাদীছের শেষাংশে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কারণ উল্লেখ করেছেন।
«يُقَاتِلُ هَذَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ عز وجل فَيُستشهد ثُمَّ يَتُوبُ اللَّهُ عَلَى الْقَاتِلِ فيسلم فيقاتل في سبيل الله عز وجل فَيُسْتَشْهَدُ»
‘‘মুমিন ব্যক্তি আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করতে গিয়ে অন্য কাফেরের হাতে শহীদ হয়। অতঃপর আল্লাহ তাআলা হত্যাকারীর প্রতি অনুগ্রহ করেন। ফলে সে তাওবা করে এবং ইসলাম কবুল করে নেয়। পরবর্তীতে সেও আল্লাহর পথে জেহাদ করতে গিয়ে শহীদ হয়। এতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার পূর্ণ অনুগ্রহ এবং সীমাহীন রহমতের প্রমাণ মিলে। কেননা মুসলিমগণ আল্লাহর রাস্তায় জেহাদ করে। কখনো এমন হয় যে, কাফেরদের কেউ তাদের কাউকে হত্যা করে ফেলে। এতে আল্লাহ তাআলা নিহত মুসলিমকে শাহাদাতের মাধ্যমে সম্মানিত করেন। অতঃপর আল্লাহ তাআলা সেই হত্যাকারী কাফেরের উপরও অুনগ্রহ করেন এবং তাকে ইসলামের পথ দেখান। ফলে সেও জেহাদে গিয়ে শহীদ হয়। পরিণামে সকলেই জান্নাতে প্রবেশ করে।
এটি আসলেই আশ্চর্যের বিষয়। হাসি সাধারণত ঐসব বিস্ময়কর বিষয় থেকেই হয়ে থাকে, যা সাধারণত খুব কমই সংঘটিত হয়। উপরের হাদীছের মাধ্যমে আমরা জানতে পারলাম যে, আল্লাহ সুবহানাহু তাআলার জন্য হাসা বিশেষণ সাব্যস্ত। হাসি তাঁর সিফাতে ফেলিয়ার মধ্যে শামিল। আল্লাহ তাআলার বড়ত্ব ও মর্যাদার জন্য যেভাবে হাসা শোভনীয়, আমরা তাঁর জন্য সেভাবেই হাসি সাব্যস্ত করি। তাঁর হাসি মানুষের হাসার মত নয়।
প্রশ্ন: জিহাদ কখন ফরজ? কুরআন ও হাদিসের আলোকে জানতে চাই।
▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬
উত্তর:
তিন অবস্থায় প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তির উপর জিহাদ ফরজ। যথা:
প্রথম: যদি কাফির ও মুসলিমদের মাঝে যুদ্ধ বেধে যায় তাহলে যুদ্ধ সক্ষম প্রতিটি ব্যক্তির উপর জিহাদ করা ফরজে আইন। এই যুদ্ধ থেকে পলায়ন করা কবিরা গুনাহ।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا زَحْفًا فَلَا تُوَلُّوهُمُ الْأَدْبَارَ - وَمَن يُوَلِّهِمْ يَوْمَئِذٍ دُبُرَهُ إِلَّا مُتَحَرِّفًا لِّقِتَالٍ أَوْ مُتَحَيِّزًا إِلَىٰ فِئَةٍ فَقَدْ بَاءَ بِغَضَبٍ مِّنَ اللَّـهِ وَمَأْوَاهُ جَهَنَّمُ ۖ وَبِئْسَ الْمَصِيرُ
"হে ঈমানদারগণ, তোমরা যখন কাফেরদের সাথে মুখোমুখী হবে (যুদ্ধ শুরু হবে) তখন পশ্চাদপসরণ করবে না। আর যে লোক সেদিন তাদের থেকে পশ্চাদপসরণ করবে, অবশ্য যে লড়াইয়ের কৌশল পরিবর্তন কল্পে কিংবা যে নিজ সৈন্যদের নিকট আশ্রয় নিতে আসে সে ব্যতীত অন্যরা আল্লাহর গযব সাথে নিয়ে প্রত্যাবর্তন করবে। আর তার ঠিকানা হল জাহান্নাম। বস্তুত: সেটা হল নিকৃষ্ট অবস্থান।" (সূরা আনফাল: ১৫ ও ১৬)
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যুদ্ধের ময়দান থেকে পালানোকে সাতটি ধ্বংসাত্মক বিষয় ও কবিরা গুনাহের মধ্যে গণ্য করেছেন।
🌀 দ্বিতীয়: যদি কাফেররা মুসলিম দেশকে ঘিরে ফেলে তাহলে প্রতিটি সক্ষম ব্যক্তির উপর দেশ ও মুসলিমদের ইজ্জত-আব্রু হেফাজতের স্বার্থে জিহাদ করা ফরজ।
এ যুদ্ধ সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করবে ওলিউল আমর তথা মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান। অন্যথায় তাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হবে। যতক্ষণ ওলিউল আমর থাকবে সে-ই তা শৃঙ্খলা বিধান করবে। এটাকে বলা হয়, প্রতিরক্ষা মূলক জিহাদ।
🌀 তৃতীয়: মুসলিম রাষ্ট্রপ্রধান যদি দেশের নাগরিক ও প্রজা সাধারণকে জিহাদের জন্য আহ্বান জানায় তাহলে প্রত্যেক সক্ষম ব্যক্তির উপর জিহাদে অংশ গ্রহণ করা ফরজে আইন হয়ে যায়। এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
وَإِذَا اسْتُنْفِرْتُمْ فَانْفِرُوا
"যখন তোমাদেরকে জিহাদে বের হওয়ার জন্য আহ্বান জানানো হয়, তখন তোমরা (জিহাদের উদ্দেশে) বের হয়ে যাও।" (সহীহ মুসলিম, হা/৪৭২৩ অধ্যায়ঃ ৩৪। প্রশাসন ও নেতৃত্ব -كتاب الإمارة)
যারা এই আহ্বান পাওয়ার পরও তাতে সাড়া দেয় না আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তিরষ্কার করে বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَا لَكُمْ إِذَا قِيلَ لَكُمُ انفِرُوا فِي سَبِيلِ اللَّـهِ اثَّاقَلْتُمْ إِلَى الْأَرْضِ ۚ أَرَضِيتُم بِالْحَيَاةِ الدُّنْيَا مِنَ الْآخِرَةِ ۚ فَمَا مَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا فِي الْآخِرَةِ إِلَّا قَلِيلٌ
"হে ঈমানদারগণ, তোমাদের কি হল, যখন আল্লাহর পথে (জিহাদে) বের হবার জন্যে তোমাদের বলা হয়, তখন মাটি জড়িয়ে ধর, তোমরা কি আখিরাতের পরিবর্তে দুনিয়ার জীবনে পরিতুষ্ট হয়ে গেলে? অথচ আখিরাতের তুলনায় দুনিয়ার জীবনের উপকরণ অতি অল্প।" (সূরা তওবা: ৩৮)
অর্থাৎ মুসলিমদের ইমাম তথা রাষ্ট্রপ্রধান যখন জিহাদের জন্য আহ্বান জানাবেন এবং অন্যান্য মুসলিম সাথে জিহাদে যাওয়ার নির্দেশ দিবে তখন সক্ষমতা থাকা অবশ্যই তাতে সাড়া দেয়া ফরজ।
▬▬▬▬●◈●▬▬▬▬