হজরত ইবরাহীম (আঃ)-এর জীবন অত্যন্ত ঘটনাবহুল। কোরআন মাজিদের বিভিন্ন সুরায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে হজরত ইবরাহীমের (আ.) বহুমাত্রিক কাহিনি। জন্ম ইরাকের এক মূর্তিপূজারির ঘরে, সেখান থেকে ফিলিস্তিনে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে অভিযাত্রা ও জীবনযাপন, স্ত্রী হাজেরা ও পুত্র ইসমাইলকে নির্জন মরুপ্রান্তরে রেখে আসা, পুত্র ইসমাইলকে কোরবানির প্রস্তুতি, কাবা শরিফ নির্মাণ, আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া- প্রতিটি ঘটনাই ইসলামের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নিয়েছে।
মুসলমানদের বিভিন্ন ইবাদত ও আচারে হজরত ইবরাহীম (আ.)-এর এসব ঘটনা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। পবিত্র দুই তীর্থভূমি মক্কা ও বাইতুল মুকাদ্দাসের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে তাঁর স্মৃতি। হজ ও কোরবানি আগাগোড়াই তাঁর স্মৃতির পুনরাবৃত্তি। এমনকি দৈনন্দিন নামাজে দরুদ শরিফেও স্মরণ করা হয় তাঁকে। আসলে মুসলিম জাতিসত্তার উন্মেষ হজরত ইবরাহীম (আ.)-এর মাধ্যমেই। কোরআনে সুরা হজের ৭৮নং আয়াতে তাঁকে মুসলিম জাতিসত্তার পিতা হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।
হজরত ইবরাহীম (আ.)-এর যুগে মানুষ তিন ধরনের পূজায় লিপ্ত ছিল। অধিকাংশ মানুষ ছিল মূর্তিপূজারি। পাথর বা কাঠের নির্মিত মূর্তির পূজা করত তারা। কেউ কেউ তারকার পূজা করত। আর কেউ রাজা ও শাসকদের পূজা করত। এসব যে পূজনীয় হতে পারে না, সম্প্রদায়ের লোকদেরকে তিনি হাতে-কলমে বুঝিয়ে দেন। তারকা পূজারিদের অসারতা প্রমাণের জন্য তিনি একটা কৌশল করেন, রাতে যখন আকাশে তারকার উদয় হলো তিনি তাদের বললেন, এই তোমাদের পূজনীয় তারকা? আচ্ছা, ঠিক আছে। সকালে যখন তারকা অদৃশ্য হয়ে গেল তিনি তাদের ডেকে বললেন, তোমাদের পূজনীয় এখন কোথায় হারিয়ে গেছে? তারপর তিনি তাদের স্পষ্টভাবে বলে দিলেন, ‘আমি অস্তগামীদের ভালোবাসি না।’ (সুরা আনআম : ৭৬)। মূর্তিপূজারিদের অসারতা প্রমাণের জন্যও কৌশল অবলম্বন করলেন। একবার এক উৎসব উপলক্ষে সবাই শহরের বাইরে চলে যায়। শহর একেবারে জনমানবশূন্য হয়ে গেলে তিনি মন্দিরে গিয়ে মূর্তিগুলো ভেঙে চুরমার করে দিলেন। তাদের বড় মূর্তির কাঁধে কুঠার ঝুলিয়ে দিলেন। উদ্দেশ্য ছিল, যাদের মধ্যে বিবেকবুদ্ধি আছে তারা যেন এসব মূর্তির অক্ষমতা বুঝতে পারে।
এ ঘটনা সম্প্রদায়ের মধ্যে তুমুল বিক্ষোভ তৈরি করল। তারা ইবরাহীম (আ.)-কে শাস্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করল। কাঠ ও লাকড়ি সংগ্রহ করল। বিশাল অগ্নিকুণ্ড বানাল। দাউদাউ আগুন প্রজ¦লিত করল। আল্লাহ তাকে সাহায্য করলেন। আগুনের কার্যকারিতা রহিত করে দিলেন। আগুনকে ফুলের বাগানে পরিণত করে দিলেন। কোরআনে এসেছে, ‘তারা বলল, একে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের উপাস্যদের সাহায্য করো। যদি তোমরা কিছু করতে চাও। আমি বললাম, হে অগ্নি! তুমি ইবরাহীমের ওপর শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও।’ (সুরা আম্বিয়া : ৬৯-৭০)। আগুন আশপাশের সবকিছু জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিলেও ইবরাহীম (আ.) ছিলেন একেবারে অক্ষত। এভাবে নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে আল্লাহ তাকে রক্ষা করলেন।
কোরআন মাজিদে হজরত ইবরাহীম (আ.)-এর দুটি চমৎকার কাহিনি বিবৃত হয়েছে। একটি তৎকালীন মূর্তিপূজারি শাসকের সঙ্গে আল্লাহর একত্ববাদ সম্পর্কিত, দ্বিতীয়টি মৃত্যুর পর পুনরুত্থান সম্পর্কে। তৎকালীন মূর্তিপূজারি শাসক ছিল নমরুদ। সে একবার ইবরাহীম (আ.)-কে রাজদরবারে ডেকে আল্লাহর সম্পর্কে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়ে। ইবরাহীম (আ.) বলেছিলেন, আমার পালনকর্তা আল্লাহ সবার জীবন দান করেন এবং মৃত্যু ঘটান। নমরুদ বলল, বরং আমি ইচ্ছা করলে মানুষকে বাঁচিয়ে দিতে পারি, ইচ্ছা করলে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারি। নিজের ক্ষমতা প্রকাশের জন্য সে জেলখানা থেকে দুজন বন্দিকে ডেকে আনেন। একজন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, আরেকজন নির্দোষ প্রমাণিত হয়ে বেকসুর খালাসের অপেক্ষায় প্রহর গুনছিল। ফেরাউন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিকে মুক্তি দিয়ে নির্দোষ আসামিকে হত্যা করল। তখন ইবরাহীম (আ.) বললেন, আমার রব তো সূর্যকে উদিত করেন পূর্বদিক থেকে, আপনি তা হলে পশ্চিম দিক থেকে উদিত করে দেখান। তখন সে কোনো পাল্টা চ্যালেঞ্জ দিতে পারেননি। (সুরা বাকারা : ২৫৮)
দ্বিতীয় ঘটনা হলো, ইবরাহীম (আ.) একবার আল্লাহর কাছে আবেদন করলেন, মানুষের পুনরুত্থান কীভাবে হবে তা যেন তাঁকে দেখানো হয়। ইবরাহীম (আ.) বললেন, হে আমার পালনকর্তা! আমাকে দেখান, কীভাবে আপনি মৃতকে জীবিত করবেন। আল্লাহ বললেন, তুমি কি বিশ্বাস করো না? তিনি বললেন, অবশ্যই বিশ্বাস করি। কিন্তু দেখতে এজন্য চাইছি, যাতে অন্তরে প্রশান্তি লাভ হয়। আল্লাহ বললেন, তা হলে চারটি পাখি ধরে সেগুলোকে পোষ মানাও। অতঃপর সেগুলো জবাই করে মাংসগুলো মিশ্রিত করে একেকটি অংশ একেক পাহাড়ের ওপর রেখে দাও। সে অনুযায়ী পাহাড়ে মাংস রেখে আসার পর নাম ধরে ডাকলে পাখিগুলো জীবিত হয়ে দ্রুত চলে এলো। (সুরা বাকারা : ২৬০)
এসব ঐতিহাসিক ঘটনাবলিতে আমাদের জন্য বহুমুখী শিক্ষা রয়েছে। আমরা তাওহিদ তথা আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস করি। যেকোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ইবরাহীম (আ.)-এর মতো বিশ্বাসে অবিচল থাকতে হবে। আল্লাহ আমাদের ঈমানকে মজবুত করে দিন।
