অতি ভক্তি দেখাতে গিয়ে যারা কবি মুহিব খানকে মহাকবি আল্লামা ইকবাল রহ. এর সঙ্গে তুলনা করতে দ্বিধাবোধ করছেন না আপনাদেরকে একটা নিদারুণ বাস্তবতা সম্পর্কে জানান দিই চলুন। তার আগে নিখাদ তাওহীদ ও ইসলামী চেতনাবোধ এমনকি এ দুয়ের বিপরীতে জা/তীয়তাবাদের ফি*তনাকে বুঝতে হবে। মানতে হবে। একইসাথে স্বীকারও করতে হবে।
ইসলাম 'ইনিল হুকমু ইল্লা লিল্লাহ' তথা পুরো পৃথিবীর ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহর বলে বিশ্বাস করে। এরপর আল্লাহর আনুগত্য স্বীকার করা প্রত্যেকটা মুমিন মুসলমানকে পুরো পৃথিবীতে স্বাধীনভাবে রাজত্ব ও বিচরণ করার জন্য উৎসাহিত করে। মুমিনের কাঁটাতারে আবদ্ধ থাকা ও আবদ্ধ থাকার মনমানসিকতা ইসলাম পছন্দ করে না। এমনকি অনুমোদনও দেয়না।
এবার মূল টপিকে আসেন। মহাকবি আল্লামা ইকবাল রহ. এর দর্শন আর কবি মুহিব খানের দর্শন!
.
পৃথিবী সমাদৃত ইসলামী চেতনাবোধ ও জাতীয়তাবাদের কাঁটাতারের গণ্ডিতে থাকা সংকীর্ণতাবোধ থেকে পুরো ব্যাপারটা আলাদা আলাদা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি চলুন। প্রথমেই আমি একদিকে আল্লামা ইকবাল রহ. এর নিখাদ তাওহীদের শক্তিতে পৃথিবী জয় করার অভিপ্রায় আরেক- দিকে কবি মুহিব খানের জাতীয়তাবাদের সংকীর্ণতাবোধ ও দেশপ্রেমের কু*ফর আপনার সামনে তুলে ধরছি। তারপর সিদ্ধান্ত আপনার। চিন্তাজগৎ আমাদের প্রত্যেকরই আছে। আমরা খুব ভেবে সিদ্ধান্ত নিবো ইনশাআল্লাহ।
১.
আল্লামা ইকবালের কবিতা—
'সবক ফের পড় সদাকাত কা, আদালাত কা শুজাআত কা।
লিয়া জায়েগা তুঝ সে কাম দুনিয়া ইমামত কা।'
সদাকাত শুজাআত ও আদালতের সবক শেখানো এমনকি পৃথিবীর ইমারত ফেরানোর কাজে উদ্বুদ্ধ করা মহাকবি জাতীয়তাবাদের গোলামী করেননি নিশ্চয়। পক্ষান্তরে কবি মুহিব খানের 'ইঞ্চি ইঞ্চি মাটি সোনার চাইতে খাটি নগদ রক্ত দিয়ে কেনা।' গানটি নিতান্তই জাতীয়তাবাদের গান। মুসলিম উম্মাহকে এই গান কোনোদিনও জাগাতে পারবে না। কারণ এটা লিখাই হয়েছে বাঙালিদের জন্য। আর পৃথিবীতে বাঙালি ছাড়াও মুসলমান রয়েছে। রয়েছে অসংখ্য অগণিত।
২.
আল্লামা ইকবালের কবিতা—
'কাভি আয় নওজোয়া মুসলিম, তাদাববুর ভি কিয়া তুম নে?
ও কিয়া গেরদু থা তু জিসকা হ্যায় এক টুটা হুয়া তারা।'
মুসলিম উম্মাহর নওজোয়ান/তাগড়া যুবকদের মহাকবি আল্লামা ইকবাল রহ. এর এই কবিতা জাগিয়েছে বহুকাল এবং জাগাবে যুগ যুগান্তর। পক্ষান্তরে কবি মুহিব খানের
'যদি আমার দেশের সীমানা বন্ধু মুছে দিতে কেউ চায়!
যদি আমার মাটির ধনসম্পদ লুটে নিতে কেউ চায়!' এহেন কবিতা মুসলিম উম্মাহকে জাগাবে না কখনোই। ভুলে যাবেন না। এই গান তো জাতীয়তাবাদের শৃংখলে থেকে যাওয়ার জন্যই তৈরি।
৩.
আল্লামা ইকবালের কবিতা—
'আসা নেহি মিটানা নাম ও নিশা হামারা। স্রেফ হিন্দুস্তা নেহি; মুসলিম হ্যায় হাম ওয়াতান হ্যায় সারা জাহা হামারা।'
রবের রুবুবিয়াত স্বীকার করা এক গোলামের দুনিয়ার পরিধি কদ্দুর হবে এটা কেবলমাত্র গত দুইশত বছরের ইতিহাসে আমাদেরকে একমাত্র আল্লামা ইকবালই জানাতে পেরেছেন। মুসলিম আমি; জেনো— আমার সীমানা নেই কোনো। এই সবকটাই দিয়ে গেছেন তিনি তথা মহাকবি রহ.।
পক্ষান্তরে মুহিব খান আমাদেরকে উপহার দিয়েছেন...
'তুমি বাঁচাও তোমার জাতি, তুমি সাজাও তোমার দেশ।
তুমি এ প্রজন্মের মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধ করো না শেষ।' দেশ জাতীয়তাবাদ ও কাঁটাতারের সীমাবদ্ধতা মুহিব খানকে কখনোই যেন ছাড়েনি। এটা উম্মাহর তরে কাজ করা নয়। চিন্তাশীল লোকেরা এই ব্যাপারটা নিয়ে আক্ষেপ করতে বাধ্য হবে। অবশ্যই হবে ইনশাআল্লাহ।
মুহিব খানের জন্য উম্মাহর কনসেপ্টে কথাটা কেমন হতে পারত তার একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে যাই!
'তুমি বাঁচাও তোমার জাতি, তুমি সাজাও তোমার পৃথিবী।
তুমি এ প্রজন্মের মু/জা/হিদ জি*হাদ ছেড়ো না কাভি!
৪.
আল্লামা ইকবালের কবিতা—
বলেন আর কোন্ কবিতার কথা উল্লেখ করব?
'খাবে গাফলত মে সুয়ে হু আয়ে মুমিনু! আয়শ ও ইশরাত বারহানে সে কিয়া ফায়েদা?' ঘুমন্ত উম্মাহকে জাগিয়েছেন এই মহাকবি ঠিক এভাবেই।
আরো বলেছেন— 'ঈমান তেরা লুট গায়া রাহযান সে হাতু সে।
ঈমান তেরা বাঁচা লে.. ও রাহবার তালাশ কার।'
আরও বলেছেন— 'আয় রুহে মুহাম্মদ!
আব তু হি বাতা, তেরা মুসলমান কিধার জায়ে?'
পুরো মুসলিম উম্মাহকে এক রুহ/একাত্মা বলে যুগে যুগে মুসলিম উম্মাহকে সর্বদায় এক হয়ে লড়াই করবার জন্য উদ্বুদ্ধ করে গেছেন তিনি। এমনকি ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধের জায়গা থেকে জাতীয়তাবাদের কাঁটাতার ছিন্ন করার জন্যই তিনি বলেছেন— ঈমান বাঁচা লে ও রাহবার তথা আমির তালাশ কার। পক্ষান্তরে মুহিব খান আমাদেরকে কী দিয়েছেন? উত্তরটা খুব সহজ।
'এটা বাংলাদেশ। এটা আফগান নয়। এটা ইরাক নয়। এটা কাশ্মীর নয়। গানেও বাংলাদেশ প্রাণেও বাংলাদেশ। সাবাশ বাংলাদেশ বিশ্বময়।'
এছাড়াও সদ্য মুক্তি পাওয়া সামরিক বাহিনীর গান....
'বাংলাদেশ সেনা নৌ বিমান বাহিনী।
সীমানায় বিজেপি অমর কাহিনী।'
এসব যেন নিতান্তই বাংলা মায়ের পূ*জা। জাতীয়তাবাদের শিকল তাঁর চিন্তাচেতনা আর মগজে ঢুকেছে। চাইলেও তিনি নিজ মাথা থেকে এসব বের করতে পারেন না। আফসোস। শত আফসোস। কিন্তু দুঃখের বিষয় হল, এটাকেই স্বাধীনতা- র নামে বীরত্বের সাথে জাতিকে খাওয়ানোর কাজটা করছেন এই মুহিব খান। মুহিব খানের গানে আমিও ছোটবেলায় প্রেরণা পেয়েছি খুব। দেশপ্রেম, ধর্মের আবেগ কিছুটা হলেও তাঁর থেকে লালন করেছি। এখনও তাঁর গান শুনি। এমনকি গণতন্ত্র নিয়ে তাঁর লেখা গানটা আমার প্রায়ই শোনা হয়। কিন্তু তার মানে এই না যে, তাঁকে মহাকবি আল্লামা ইকবাল রহ. এর সাথে তুলনা করা হবে আর আমিও সেটাকে প্রশ্রয় দিব।
হ্যাঁ, এখন প্রশ্ন আসা খুব স্বাভাবিক, আল্লামা ইকবালও তো জাতীয়তাবাদের গান গেয়েছেন পক্ষান্তরে মুহিব খান গেয়েছেন ইসলামের নিখাদ তাওহীদের গান।
যেমন— আল্লামা ইকবালের জাতীয়তাবাদের গান 'সারে জাহা সে আচ্ছা হিন্দুস্তা হামারা' পক্ষান্তরে মুহিব খানের দ্বীনী চেতনাবোধ জাগ্রত করবার অমায়িক গান 'হে যুবক তুমি বাঙালি হও কিংবা ইন্ডিয়ান, কিবা জার্মানি জাপানি চায়নিজ রাশিয়ান, স্পেনিশ ডেনিশ ফরাসি কিংবা ব্রিটিশ আমেরিকান, আরবী আজমী ইরানি তুরানি তুর্কি বা আফগান— মুসলমান, তুমি তো মুসলমান।
এইখানে উত্তর খুব সহজ। আল্লামা ইকবাল রহ. এর জাতীয়তাবাদের এই গান শুরু সময়ের। শেষ সময়ে তিনি নিতান্তই জা/তীয়তাবাদকে ঘৃ/ণা করতেন এবং মুসলিম উম্মাহকে জাগাতে ইসলামের মূল্যবোধ নিয়ে কবিতা লিখে গেছেন। পক্ষান্তরে মুহিব খানের ইসলামী মূল্যবোধের গান শুরু সময়ের। আর জাতীয়তাবাদের গোলামী এসে শুরু করেছেন জীবনের শেষ সময়ে।
এছাড়া সংখ্যা দিয়ে ব্যাপারটাকে জাস্টিফাই করা যেতে পারে। আল্লামা ইকবাল রহ. ইসলামী মূল্যবোধের পক্ষে কয়টা কবিতা লিখেছেন আর জাতীয়তাবাদের পক্ষে কয়টা? তাহলেই বিষয়টি একেবারে পানির ন্যায় পরিষ্কার হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে মুহিব খান জাতীয়তাবাদের পক্ষে গান গেয়েছে কয়টা আর ইসলামী মূল্যবোধের পক্ষে কয়টা! জাতীয়তাবাদের এই কবির ইসলামী মূল্যবোধ নিয়ে গাওয়া গান দুই একটা ছাড়া খুঁজেই পাবেন না। অথচ আল্লামা ইকবাল রহ. তাঁর বিপরীত।
আল্লামা কী, কে আর কী তাঁর দর্শন সেটা বুঝাতে ছোট্ট একটা কবিতা শুনাই আপনাদের।
'ফতুয়া হ্যায় শায়খ কা, ইয়ে যামানা কলম কা হ্যায়।
দুনিয়া মে আব রাহি নেহি তলোয়ার কারগার।'
[শায়খের ফতুয়া—এখন সময় কলমের।
দুনিয়াতে তরবারির কাজ আর সচল রইলো না।
তথা 'জি*হাদ হবে কলম দ্বারা'এতটুকু ফতুয়া ইসলামকে মুছে ফেলেছে।]
এতক্ষণের বিশ্লেষণ বুঝে থাকলে এখন আপনি বলতে বাধ্য হবেন যে...
কই মহাকবি আল্লামা ইকবাল
আর কই বাংলার গোলামের ছাল?
পরিশেষে বলতে চাই। আল্লামা ইকবাল রহ. এর দর্শন, চিন্তা, চেতনাবোধ এসবকিছুই ফিকরিইয়াতের জায়গা থেকে উপলব্ধি করার চেষ্টা করবেন এই আবেদন রইলো। মুহিব খানের প্রতি আপনার ভক্তি আছে ভাল কথা। তাই বলে তাঁর বাদ্যযন্ত্রের ব্যাবহার আর জাতীয়তাবাদের প্রমোট আপনার কাছে অনুসরণীয় অনুকরণীয় হতে পারে না কখনোই। উম্মাহর মুক্তি চাওয়া লোক এটা কখনোই মানবে না। আমিও না। আশাকরি ব্যাপারটা উপলব্ধি করার চেষ্টা করবেন। ওয়াল্লাহুল মুয়াফফিকুল মুঈন।
